ওঙ্কার ডেস্ক : ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পশ্চিমের শক্তিগুলি, বিশেষ করে আমেরিকা বারবার রাশিয়ার তেল কেনার বিষয়ে ভারতকে কটাক্ষ করে আসছে। এই বিষয়ে ভারত অবশ্য বরাবর তার অবস্থান স্পষ্ট করে আসছে। জানিয়েছে, দেশের স্বার্থকেই দিল্লি অগ্রাধিকার দেবে। অর্থাৎ সংকটকালীন পরিস্থিতে জ্বালানির যোগান দিতে ভারত তেল মজুত করবে। অথচ বুধবার সংবাদ মাধ্যমকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানালেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে।” মার্কিন প্রেসিডেন্টের এধরণের বক্তব্যে ফের নড়েচড়ে বসলো আন্তর্জাতিক দুনিয়ে। যে ইস্যুতে ভারত মার্কিন সম্পর্কের চিড় ধরল, যার ফলে সে দেশে ভারতীয় পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট তা এত সহজে ভারত মেনে নেবে এটা বাস্তবিকই অবিশ্বাস্য বলে মনে করেছেন অনেকেই। ফলে ফের বিতর্কের ঝড় ওঠে। যদিও ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি ভারত।
বৃহস্পতিবার দিল্লি তেল আমদানি নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে কিন্তু সেখানে ট্রাম্পের প্রসঙ্গ নেই। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল যে বিবৃতি দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে, “ভারত তেল ও গ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমদানিকারক। অস্থির জ্বালানি পরিস্থিতিতে ভারতীয় গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের ধারাবাহিক অগ্রাধিকার। আমাদের আমদানি নীতিগুলি সম্পূর্ণরূপে এই উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হয়।” একই সঙ্গে জয়সওয়াল এও জানিয়েছেন, “স্থিতিশীল জ্বালানি মূল্য এবং সুরক্ষিত সরবরাহ নিশ্চিত করা আমাদের জ্বালানি নীতির দুটি লক্ষ্য। এর মধ্যে রয়েছে আমাদের জ্বালানি উৎসের বিস্তৃত ভিত্তি তৈরি করা এবং বাজারের পরিস্থিতি পূরণের জন্য যথাযথভাবে বৈচিত্র্য আনা।”
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র একজায়গায় আমেরিকার প্রসঙ্গে বলেছেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলতে গেলে, আমরা বহু বছর ধরে আমাদের জ্বালানি ক্রয় সম্প্রসারণের চেষ্টা করে আসছি। গত দশকে এটি ধারাবাহিকভাবে এগিয়েছে। বর্তমান প্রশাসন ভারতের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা আরও গভীর করার আগ্রহ দেখিয়েছে। আলোচনা চলছে।”
কিসের ভিত্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতের তেল আমদানি নিয়ে এত বড় একটি দাবি করে বসলেন তা স্পষ্ট নয়। এর আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফা ভাবে নিজের বক্তব্য দিল্লির ঘাড়ে চাপিয়েছেন। ভারত পাক সংঘর্ষ বিরতি নিয়ে তিনি মধ্যস্ততাকারীর জোরাল দাবি তুলেছিলেন। বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন সভায় তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, তাঁর মধ্যস্থতার জন্যই দুই পরমাণু শক্তিধর দেশ যুদ্ধ থেকে বিরত থেকেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যে বিতর্কের ঝড় ওঠে। পাকিস্তান ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করলেও পরে অবস্থান বদলায়। সেই বিতর্কের রেশ থামতে না থামতেই রাশিয়ার তেল ইস্যুতে ফের মার্কিন প্রেসিডেন্ট একতরফা ভাবে নরেন্দ্র মোদীকে টেনে আনলেন। বললেন, “উনি (মোদী) আমায় আজ আশ্বাস দিয়েছেন যে, রাশিয়া থেকে তাঁরা আর তেল কিনবেন না। আমরা চাই চিনও একই পথে হাঁটুক।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য নিয়ে ভারত সরাসরি মুখ না-খুললেও অনেকেই মনে করছেন, নয়াদিল্লির তরফে বৃহস্পতিবার এই বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হল যে, তেল কেনার বিষয়ে স্বাধীন ভাবেই সিদ্ধান্ত নেবে দিল্লি। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মস্কোর উপর আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলির আর্থিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার থেকে সস্তায় অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়িয়ে দেয় ভারত। গত কয়েক বছরে ভারতে রুশ তেল আমদানির পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ০.২ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ। তেল আমদানি নিয়ে মার্কিন চাপের মুখে ভারত বারবার জানিয়ে এসেছে, দেশের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেবে তারা।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবির পর ভারত তেল কেনা নিয়ে কী অবস্থান নেবে, তা এখনও স্পষ্ট ভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে নয়াদিল্লির বিবৃতি দেখে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ব্যাপারে ভবিষ্যতেও পুরোনো অবস্থান বজায় রাখবে ভারত।
বিদেশমন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্কর এই বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন। বলেছেন, তারা কেবল তার নাগরিকদের জন্য সেরা চুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি পশ্চিমের দ্বৈত মানদণ্ডের দিকেও ইঙ্গিত করেছেন, বলেছেন যে “ইউরোপের সমস্যাগুলি বিশ্বের সমস্যা, কিন্তু বিশ্বের সমস্যাগুলি ইউরোপের সমস্যা নয়” এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।
এর আগে, ভারত-পাক সংঘর্ষ বিরতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছল বিরোধীরা। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বলেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদী ট্রাম্পকে ভয় পাচ্ছেন”। নরেন্দ্র মোদীকে জড়ে ট্রাম্প যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ফলে ওয়াশিংটনে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছেন তাতে ফের জাতীয় রাজনীতি উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে রাজৈনিতক মহল।
