
প্রাইমা হোসেন
একটি প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক ভাবে সামনে আসে, তা হল- বাংলাদেশে দুর্গাপূজার সময় রাষ্ট্রকে কেন তার নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে সুরক্ষা প্রদান করতে হয় ? আমি আমেরিকায় দেখেছি— নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ার, ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস, ভার্জিনিয়া কিংবা নিউ জার্সিতে—হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী মা দুর্গার পূজা করেন। সেখানে কোনো পুলিশ, সেনাবাহিনীর প্রয়োজন পড়ে না। এটি একটি খ্রিস্টান-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, অথচ সেখানে প্রত্যেকে স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন; কেউ তাতে বাধা দেয় না। বাংলাদেশের সংবিধানেও ৪১(১)(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—”প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রয়েছে।” সংবিধানের মূল নীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। তাহলে কেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে এর সুরক্ষায় নিয়োজিত থাকতে হয় ? তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট—সমস্যাটি আমাদের ভেতরেই রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই কোনো একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী এই হামলাগুলো চালায়। এই সত্যটিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
১৯৪৭ সালের আগে, এই ভূখণ্ডে দুর্গাপূজা ছিল উৎসবের প্রাণ। ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনা কালী মন্দির—কিংবা বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট—সর্বত্রই মানুষ নির্ভয়ে দুর্গাপূজা উদযাপন করত। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ১৯৪৬ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই দেশে হিন্দুরা বারবার হামলার শিকার হয়েছে। ১৯৪৬ সালের নোয়াখালীর দাঙ্গা, এরপর ১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালের ঘটনা এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে হিন্দুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটান। তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধানে চারটি মূলনীতি—ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র—প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর শাসনকালে দুর্গাপূজা অনেকটা রাষ্ট্রীয় উৎসবের মতোই উদযাপিত হত। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সবকিছু বদলে যায়। জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেন এবং সেখানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ যুক্ত করেন। রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায়। এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
সেই সময় থেকেই এক নতুন রাজনীতির সূচনা হয়। দুর্গাপূজা মানেই যেন এক ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত শাসনকালে ভোলা, লালমনিরহাট, বরিশাল, সাতক্ষীরা ও গোপালগঞ্জে হিন্দুদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, মন্দিরে ভাঙচুর এবং ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছিল। শাহরিয়ার কবিরের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অনুসন্ধানে ৫ হাজারেরও বেশি হামলার তথ্য উঠে আসে।
২০২১ সালে কুমিল্লায় কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে সারা দেশে ৮০টিরও বেশি মন্দিরে ভাঙচুর চালানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবারও একই চিত্র—যশোর, খুলনা, পটুয়াখালি, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় কোথাও মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার বলেছে—বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন একটি চলমান প্রক্রিয়া।
আমেরিকার সঙ্গে পার্থক্যটা কোথায় ?
আমেরিকা একটি খ্রিস্টানপ্রধান দেশ হলেও, রাষ্ট্র কখনোই বলে না যে—এটি কেবল খ্রিস্টানদের দেশ। সেখানে সংবিধানের ‘ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট’ বা প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী, রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না। অর্থাৎ, রাষ্ট্র কোনো ধর্মকেই রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে চাপিয়ে দেবে না। তাই যখন টাইমস স্কয়ারে দুর্গাপূজা হয়, তখন পুলিশ কেবল যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু কোনো পাহারার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, সেখানে কেউ এমনটা মনে করে না যে—হিন্দুরা পূজা করলে ইসলাম বা খ্রিস্টধর্ম ছোট হয়ে যাবে। ফ্রান্সে ১৯টি জায়গায় পূজা হয়েছে, এমনকি মুসলিমপ্রধান দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতেও কোনো ঝামেলা ছাড়াই পূজা উদযাপিত হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশে একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছে যে—‘হিন্দুরা সংখ্যায় কম, তাই তাদের দমন করে রাখতে হবে।’ কারা এই গোষ্ঠী ? যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, যারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত, যারা মনে করে বাংলাদেশ কেবল মুসলমানদের—তারাই এই মতাদর্শের ধারক। তারা সংবিধান মানে না, তারা মুক্তিযুদ্ধকেও বিশ্বাস করে না।
আর ঠিক এই কারণেই তাদের থামানোর জন্য পুলিশ, র্যাফ, সেনাবাহিনী এবং আনসার বাহিনীর প্রয়োজন পড়ে। ২০২৪ সালে শারদীয় দুর্গাপূজার সময় ৩২ হাজার মণ্ডপে প্রায় ২ লাখ পুলিশ ও আনসার সদস্যকে মোতায়েন করতে হয়েছিল। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন ? উৎসবের আনন্দ ছাপিয়ে সেখানে বিরাজ করছে আতঙ্ক।
এর একটাই সমাধান—রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব চরিত্রে ফিরে আসতে হবে। তাকে ফিরে যেতে হবে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭২ সালের সংবিধানে। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান অধিকার। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে হবে। পাঠ্যপুস্তক থেকে ‘হিন্দুরা মালাউন’—এ ধরনের বিদ্বেষমূলক কথা মুছে ফেলতে হবে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এখন পর্যন্ত মন্দির ভাঙচুরের কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি। বিচার না থাকলে অপরাধ কেবল বাড়তেই থাকবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে দুর্গাপূজার সময় পুলিশের প্রয়োজন পড়বে না। যেখানে মা দুর্গার আগমন ঘটবে শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে, পুলিশের সাইরেনের শব্দে নয়। যেখানে আমেরিকার মতো বাংলাদেশেও বলা যাবে— ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব সবার। কারণ, এই দেশ সবার—হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সবার। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত কেবল মুসলমানদের রক্ত ছিল না, তাতে হিন্দুদের রক্তও মিশে ছিল। এই সত্য ভুলে গেলে বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারবে না।