ওঙ্কার ডেস্ক: ভারতীয় বায়ুসেনার আধিকারিক ও ইসরো-প্রশিক্ষিত মহাকাশচারী গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা সফলভাবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে নিজের মিশন সম্পন্ন করে ভারতের মহাকাশ অভিযানে নতুন মাইলফলক তৈরি করেছেন। স্পেসএক্সের ক্রু ড্রাগনে চেপে ‘অ্যাক্সিয়ম-৪’ মিশনের অংশ হিসেবে তিনি পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করেন ২৫ জুন, ২০২৫। পরদিনই মহাকাশযানের সফল ডকিং হয় আন্তরজাতিক মহাকাশ গবেষনা কেন্দ্রে। তারপর টানা ১৮ দিন সেখানে নানা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরিক্ষা করে ১৫ জুলাই বাকি ক্রু মেম্বারদের সাঙ্গে পৃথিবীতে ফিরে আসেন শুভাংশু শুক্লা। আর এই সফল অভিযানই ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মকে মহাকাশ ও তার সঙ্গে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়কে সহজভাবে বোঝার এক নয়া দিশা দেখিয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ডঃ জিতেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, এই ঐতিহাসিক যাত্রা ভারতের মহাকাশ অভিযানকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করবে।
প্রসঙ্গত, এই মিশন শুরুর আগে ফ্যালকম-৯ বুস্টারের প্রেশার ফিডলাইনের ওয়েল্ড জয়েন্টে একটি ক্ষুদ্র ফাটল ধরা পড়ে। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ইসরোর বিজ্ঞানীরা ত্রুটি চিহ্নিত করে মেরামতের ওপর জোর দেন। এর ফলে শুধু একটি মহাকাশযান নয়, রক্ষা পায় ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন। এই অভিযানে শুক্লা মহাকাশে নিয়ে গিয়েছেন সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা। এর মধ্যে রয়েছে মহাশূন্যে মেথি ও মুগের বীজের অঙ্কুরোদগম, যা ভবিষ্যতের মহাকাশ খাদ্য ব্যবস্থার পাশাপাশি দেশের উল্লম্ব কৃষি ও জলসংকট দূরীকরণে সহায়ক হতে পারে।
পরীক্ষাগুলির মধ্যে রয়েছে টার্ডিগ্রেডের জিনগত আচরণ পর্যবেক্ষণ, যা জৈবিক সহনশীলতা ও টিকা উদ্ভাবনের পথে নতুন দিশা দেখাবে বলে মনে করেছেন বিশেষক মহল। শুক্লা মানব পেশী কোষের ক্ষয় সংক্রান্ত ‘মায়োজেনেসিস’পরীক্ষা করেছেন, যা পেশী ক্ষয় রোধে ও প্রবীণদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। এছাড়া সায়ানোব্যাক্টেরিয়া ও ধান, মটর, তিল, বেগুন, টমেটোর মতো ভারতীয় শস্যের মহাশূন্যে বেড়ে ওঠার উপরেও পরীক্ষা চালানো হচ্ছে, যা চরম জলবায়ুতে সহনশীল নতুন প্রজাতির পথ খুলতে পারে।
এই মিশন স্পেসএক্স, নাসা, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ও অ্যাক্সিয়ম স্পেসের সঙ্গে ভারতের সম-অংশীদারিত্বের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই মিশনের মধ্য দিয়ে।মহাকাশ যানে ফাটল চিহ্নিত করে তা মেরামত করানোর জন্য ভারতীয় পক্ষের চাপই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। গোটা অভিযানের সময় ইসরোর ফ্লাইট সার্জেনরা শুক্লার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর নজর রেখেছিলেন। এবং পৃথিবী তে ফেরার পর তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে শুভাংশুকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ ট্রেনিং। মহাকাশে থেকেও তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পড়ুয়াদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন করেন, বিজ্ঞানচেতনা ছড়িয়ে দেন লক্ষ্ণৌ থেকে শিলং, ব্যাঙ্গালোর থেকে ত্রিবান্দ্রম পর্যন্ত। শুক্লা সুস্থভাবে ফিরে এসে দেশে এনেছেন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, নমুনা ও বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি। এগুলি ভারতের গগনযান মিশন ও ভবিষ্যতের মহাকাশ কেন্দ্র গড়তে বড় ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে। এবিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, “এবার ভারতীয় গগনযানে করে ভারতীয়রা মহাকাশ পাড়ি দেবে, আর শুভাংশু শুল্কার এই সফল মিশনই সেই অভিযানের শুরু”।
শুভাংশু শুল্কার সফল অভিযান প্রমাণ করছে, ভারতের কাছে আজ মহাকাশ কেবল বিস্ময়ের নয়, বাস্তব প্রয়োগের জায়গা। এই মহাশূন্যের গবেষণার সুফল পৌঁছে যাবে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট থেকে শুরু করে শহরের হাসপাতালগুলিতে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে। এই মহাকাশ সফর শুধু এক মহাকাশচারীর কাহিনি নয়, গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লার মহাকাশযাত্রা নতুন ভারতের স্বপ্ন ও সাহসিকতার প্রতীক হয়ে থেকে যাবে।
