এশিয়ান গেমস শেষ। পদক তালিকায় ভারতের অবস্থান সেই চতুর্থ। বাইরে থেকে দেখলে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু সংখ্যার দিকে একটু গভীরভাবে তাকালেই ছবিটা অন্য কথা বলে। চার বছর আগে হ্যাংঝাউয়ে ১০৭টি পদক জিতে ভারত যে উচ্চতায় পৌঁছেছিল, আইচি-নাগোয়ায় সেই জায়গা ধরে রাখা যায়নি। এবার ভারতের ঝুলিতে এসেছে ৮৫টি পদক। সোনার সংখ্যাও কমেছে- হ্যাংঝাউয়ের ২৮ থেকে এবার ২১। অর্থাৎ অবস্থান অপরিবর্তিত থাকলেও পারফরম্যান্সের ভিতরে রয়েছে স্পষ্ট ওঠানামা।
এখানেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে, গত চার বছরে ভারতীয় ক্রীড়ার অগ্রগতি ঠিক কতটা? পদক তালিকায় চতুর্থ স্থান নিঃসন্দেহে সম্মানের। কিন্তু শুধু অবস্থান দিয়ে দেশের ক্রীড়া উন্নয়নের ছবি বিচার করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়। কারণ এশিয়ার ক্রীড়া মানচিত্রে ভারত এখনও চীন, জাপানের মতো শক্তির সঙ্গে ব্যবধান কমাতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে সেই দূরত্ব বজায় রয়েছে।
এশিয়ান গেমস আসলে শুধু কয়েকটি পদকের লড়াই নয়। একটি দেশের ক্রীড়া পরিকাঠামো, প্রতিভা অন্বেষণ, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, কোচিং, ক্রীড়া বিজ্ঞান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখা যায় এই মঞ্চে। সেই জায়গা থেকেই নাগোয়ার ফলাফলকে দেখা দরকার। কোথাও সাফল্য এসেছে, কোথাও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কয়েকটি খেলায় ভারত নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে, আবার বেশ কিছু অলিম্পিক ইভেন্টে ধারাবাহিকতার অভাবও চোখে পড়েছে। ভারতের ক্রীড়া বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই। ১৪০ কোটির বেশি মানুষের দেশে প্রতিভার অভাব নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নিয়মিত উঠে আসছে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়। কিন্তু প্রতিভাকে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়ে পরিণত করার পথটা এখনও মসৃণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রতিভা, পরিবারের লড়াই এবং খেলোয়াড়ের নিজের জেদই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো ও বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ সবসময় সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় এখন শুধুমাত্র প্রতিভা দিয়ে সাফল্য পাওয়া কঠিন। একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের পিছনে থাকে পুষ্টিবিদ, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট, বায়োমেকানিক্স বিশেষজ্ঞ, ডেটা বিশ্লেষক থেকে শুরু করে আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রযুক্তি। বিশ্বের শীর্ষ ক্রীড়া শক্তিগুলি বহু বছর ধরেই এই ব্যবস্থাকে তাদের ক্রীড়া কাঠামোর অংশ করে ফেলেছে। ভারতেও কিছু ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন শুরু হয়েছে, কিন্তু তা এখনও সর্বস্তরে পৌঁছয়নি। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তৃণমূল স্তরে পরিকাঠামো তৈরি করা। শুধু বড় শহরে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বানালেই হবে না। জেলা, মহকুমা এমনকি স্কুল স্তর পর্যন্ত খেলাধুলার সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে। একটি আধুনিক অ্যাথলেটিক্স ট্র্যাক থেকেই একাধিক ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্টের জন্য খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব। একইভাবে উন্নতমানের সুইমিংপুল তৈরি হলে সাঁতার ও জলক্রীড়ার বহু ইভেন্টে প্রতিভা তুলে আনা যায়। অর্থাৎ একটি পরিকাঠামোকে কেন্দ্র করেই একাধিক অলিম্পিক ইভেন্টের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা সম্ভব। তার জন্য প্রয়োজন স্কুল স্তর থেকেই মেধা খোঁজা। প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিভাবান শিশু হয়তো কোনওদিন বড় শহরের স্পোর্টস অ্যাকাডেমিতে পৌঁছতেই পারল না। সেই প্রতিভা খুঁজে বের করার দায়িত্ব নিতে হবে সংগঠিত ব্যবস্থাকে। জেলা ভিত্তিক প্রতিভা অন্বেষণ, নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং ধাপে ধাপে জাতীয় স্তরের অ্যাকাডেমিতে তুলে আনার ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।
আরও একটি জায়গায় ভারতকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে—ক্রীড়া বিজ্ঞান। আধুনিক খেলাধুলায় বিজ্ঞান এখন সাফল্যের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। খেলোয়াড়ের শরীর, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম, চোটের ঝুঁকি, মানসিক চাপ—সবকিছু নিয়েই পরিকল্পনা করতে হয়। অথচ দেশের বহু প্রতিভাবান খেলোয়াড় এখনও সেই পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার বাইরে। বিদেশে কাজ করা ভারতীয় ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশে উন্নত গবেষণাগার, স্পোর্টস মেডিসিন সেন্টার এবং ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এখানে ক্রিকেটের সঙ্গে অন্য খেলাগুলির তুলনাটাও প্রাসঙ্গিক। ক্রিকেটে দেশের পরিকাঠামো, অর্থ এবং দর্শক—সবকিছুই বিশাল। সেই বিনিয়োগের ফলও আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্পষ্ট। কিন্তু অলিম্পিক ও এশিয়ান গেমসের বহু ইভেন্ট এখনও সেই মাত্রার গুরুত্ব পায় না। ফুটবল, ক্রিকেট বা কয়েকটি জনপ্রিয় খেলার বাইরে আরও অনেক খেলায় একই ধরনের পরিকল্পিত বিনিয়োগ দরকার।
ভারতের আর একটি পুরনো সমস্যা ক্রীড়া প্রশাসন। বিভিন্ন জাতীয় ও রাজ্য ক্রীড়া সংস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক টানাপোড়েন, পদ ধরে রাখার প্রবণতা এবং ক্রীড়া রাজনীতির অভিযোগ শোনা যায়। একজন প্রশাসকের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত খেলোয়াড় এবং খেলার উন্নতি। পদ বা ক্ষমতা নয়। প্রশাসনে দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অবশ্য সব দায় সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। খেলোয়াড়, কোচ, ক্রীড়া সংস্থা, কর্পোরেট সংস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব পক্ষকে নিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন। একটি প্রতিভা আন্তর্জাতিক পদক জেতার পর তাকে সংবর্ধনা দেওয়া সহজ। কিন্তু সেই খেলোয়াড় যখন ১০-১২ বছর বয়সে প্রথমবার মাঠে নামে, তখন থেকেই তার পাশে থাকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নাগোয়ায় ভারতের ৮৫টি পদক তাই একেবারে ব্যর্থতার ছবি নয়। আবার এটিকে নিছক সাফল্য বলেও দায়িত্ব শেষ করা যায় না। চতুর্থ স্থান ভারতীয় ক্রীড়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে, আর পদক কমে যাওয়া দেখাচ্ছে কোথায় আরও কাজ প্রয়োজন। আগামী লক্ষ্য যদি সত্যিই অলিম্পিকের পদক তালিকায় বড় লাফ দেওয়া হয়, তাহলে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু কতগুলি সোনা বা মোট কতটি পদক- তা নয়। প্রশ্ন হল, চার বছর পরে আরও বেশি ভারতীয় খেলোয়াড় কি বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ পাবে? আরও বেশি জেলা থেকে কি আন্তর্জাতিক প্রতিভা উঠে আসবে? ক্রীড়া বিজ্ঞান কি পৌঁছবে তৃণমূল স্তরে? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তবেই এশিয়ান গেমসের পদক তালিকায় চতুর্থ স্থান সত্যিকারের অগ্রগতির সিলমোহর হয়ে উঠবে। নাহলে, শুধু পদক গুনে সন্তুষ্ট থাকলে ভারতের ক্রীড়া শক্তি হয়ে ওঠার স্বপ্নটা অপূর্ণই থেকে যাবে।