নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা; সুন্দরবনের মাটিতে দাঁড়িয়ে উন্নয়নের অন্য নাম ‘মুক্তি’। জন্মভূমিতেই স্বপ্ন গড়ছেন বিশিষ্ট সমাজসেবী। সুন্দরবনের বুকে পূর্ব শ্রীধরপুরে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী উন্নয়নের দৃষ্টান্ত—‘মুক্তি প্রকল্প’
সুন্দরবন মানেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর নদীভাঙনের সঙ্গে প্রতিদিন সহাবস্থান এখানকার মানুষের। সুন্দরবনের মুক্তি প্রকল্পের নেপথ্যে রয়েছেন এলাকার নির্ভীক বিশিষ্ট সমাজসেবী শংকর হালদার। গ্রামের ছেলে লেখাপড়া শিখে উচ্চপদস্থ পদে চাকুরি, পরিচিতি ও সাফল্য অর্জনের পরও তিনি নিজের জন্মভূমিকে ভুলে যাননি। বরং উন্নত প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব চিন্তাভাবনাকে হাতিয়ার করে গ্রামেই গড়ে তুলেছেন ভবিষ্যতের বাসস্থানের মডেল।
মুক্তি গ্রামে নির্মিত ঘরগুলি লোহার ব্যবহার ছাড়াই তৈরি। জাপানি প্রযুক্তিতে বাঁশ, খড় ও দড়ির সমন্বয়ে তৈরি এই ঘরগুলি প্রাকৃতিক বিপর্যয় সহনশীল। আশ্চর্যের বিষয়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি হওয়া সত্ত্বেও ঘরগুলিতে রয়েছে এসি, আধুনিক টয়লেটসহ সব রকম সুযোগ-সুবিধা। পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই যে আধুনিকতা সম্ভব—তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই প্রকল্প। মুক্তি গ্রামের রাস্তার দু’ধারে নানা ধরনের ফুলের গাছ লাগিয়ে সাজানো হয়েছে এলাকা। সপ্তাহের যে কোনও দিন বহু মানুষ এই ব্যতিক্রমী স্থাপনা দেখতে ভিড় করেন। অনেকের কাছেই জায়গাটি এখন পরিচিত ‘মুক্তি ’ নামে। কাউকে কাউকে বলতে শোনা যাচ্ছে ‘মুক্তি পার্ক” কারণ ছুটির দিন-সহ সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিন বহু পর্যটকের আনাগোনা চলছে। সমস্ত দিক থেকে বিচার করলেই পার্কের মতোই করে সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে মুক্তিকে, তবে এটি পার্ক নয় একটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নানা রকম প্রকল্পের মডেল চিত্র।
রায়দিঘি থেকে অল্প সময়ের যাত্রায় যেকোনো গাড়িতেই এখানে পৌঁছনো যায়, ফলে দর্শনার্থীদের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে। তবে মুক্তি সংস্থার কাজ শুধু সুন্দরবনেই সীমাবদ্ধ নয়। শংকর হালদারের নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বর্তমানে ৪৫টি প্রকল্প মানুষের সেবায় কাজ করছে। শিক্ষা, বাসস্থান, দুর্যোগ মোকাবিলা ও সামাজিক উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রে মুক্তির উদ্যোগ ইতিমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও অর্থ বা খ্যাতির পিছনে না ছুটে শংকর হালদার বছরের অধিকাংশ সময় কাটান নিজের গ্রামেই। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে থেকে তাঁদের সমস্যা সমাধানে সামিল হওয়াই তাঁর কাজ। তাঁর বিশ্বাস, উন্নয়ন তখনই সার্থক হয়, যখন তার সুফল সবার আগে পৌঁছে যায় নিজের মাটির মানুষের কাছে।
শহরমুখী সাফল্যের ভিড়ে দাঁড়িয়ে শংকর হালদারের এই উদ্যোগ নতুন করে ভাবতে শেখায়—উন্নয়নের অন্য পথও আছে। যে পথে আধুনিকতা ও প্রকৃতি পরস্পরের বিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। সুন্দরবনের মাটিতে দাঁড়িয়ে ‘মুক্তি’ আজ সেই পথেরই নাম।
