ওঙ্কার ডেস্ক : তামিলনাড়ু সরকারের দায়ের করা এক মামলার রায় ঘোষণা করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। ১২ এপ্রিলের সেই নির্দেশ নিয়ে আপত্তি তোলেন অনেকেই। শীর্ষ আদালত কী এভাবে ৩ মাসের সময়সীমা বেঁধে দিতে পারে ? তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। কেন্দ্রও এই পরিস্থিতিতে তারা রাজ্যপালকে বিল সইয়ের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার বিরোধী বলে জানিয়ে দেয় সুপ্রিম কোর্টকে। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির পাঠানো ১৮টি প্রশ্নের মধ্যে ১১টি প্রশ্নের উত্তর দেয় শীর্ষ আদালত। এদিন প্রধান বিচারপতি ভি আর গাভাই স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেন, “রাজ্যপালকে কত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেই সময়সীমাও আদালত নির্ধারণ করে দিতে পারে না।”
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু যে সব প্রশ্ন করেছিলেন এবং তার উত্তরে শীর্ষ আদালত কী জানালো তা একবার দেখে নেওয়া যাক…..
প্রশ্ন- ১ : কোনও রাজ্যের বিধানসভায় পাশ হওয়া বিল যখন রাজ্যপালের কাছে পাঠানো হয় (অনুচ্ছেদ ২০০ অনুযায়ী), তখন রাজ্যপালের হাতে কি কি সাংবিধানিক বিকল্প থাকে ?
উত্তর-১ : রাজ্যপালের সামনে বিল এলে তিনি কেবল তিনটি কাজ করতে পারেন— প্রথমত, সই করা। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো। এবং তৃতীয়ত, সই না করে মন্তব্য-সহ ফেরত পাঠানো। এই তিনটি বিকল্পই সংবিধানে নির্দিষ্ট। কোনও চতুর্থ বিকল্প নেই। অবশ্য তৃতীয় বিকল্প (ফেরত পাঠানো) অর্থ বিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
প্রশ্ন-২ : বিল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রাজ্যপাল কি মন্ত্রিসভার পরামর্শ মানতে বাধ্য ?
উত্তর-২ : ২০০ ধারার ক্ষেত্রে রাজ্যপাল সবসময় মন্ত্রিসভার পরামর্শ মানতে বাধ্য নন। অর্থাৎ এই জায়গায় কিছু ‘বিবেচনা’-র অধিকার রয়েছে।
প্রশ্ন-৩ : অনুচ্ছেদ ২০০ অনুযায়ী রাজ্যপালের যে বিবেচনাধিকার রয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত কি আদালত পর্যালোচনা করতে পারে ?
উত্তর-৩ : রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত বিচারযোগ্য নয়। ২০০ ধারা অনুসারে রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত আদালত যাচাই করতে পারবে না। কিন্তু যদি অকারণে দীর্ঘ অথবা ব্যাখ্যাতীত দেরি হয় তাহলে যথাসম্ভব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা আদালত বলতে পারে। রাজ্যপাল কোন সিদ্ধান্ত নেবেন তা আদলত কখনো বলবে না।
প্রশ্ন-৪ : রাজ্যপাল যখন কোনও বিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন (অনুচ্ছেদ ২০০ অনুযায়ী), তখন আদালত কি সেটা পরীক্ষা করতে পারে ? না কি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৬১-এর কারণে আদালত একেবারেই এতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না ?
উত্তর-৪ : ৩৬১ ধারা রাজ্যপালকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা দেয়। কিন্তু পদটিকে বিচারব্যবস্থার বাইরে রাখে না। রাজ্যপালকে ব্যক্তিগত ভাবে আদালতে তলব বা জিজ্ঞাসা করা যাবে না। কিন্তু রাজ্যপালের দফতর আদালতের অধীনে থাকবে। তাই দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তা ৩৬১ ধারা দিয়ে রক্ষা করা যাবে না।
প্রশ্ন-৫ : সংবিধানে রাজ্যপালের জন্য কোনও সময়সীমা বা কী ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তা পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ নেই। তা হলে কি আদালত নিজ আদেশে রাজ্যপালের জন্য সময়সীমা ঠিক করে দিতে পারে এবং কি ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তা বলে দিতে পারে ?
উত্তর-৫ : ২০০ এবং ২০১ অনুচ্ছেদের ধারাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেখানে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সাংবিধানিক প্রণেতারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থিতিস্থাপকতার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে আমাদের মতো একটি ফেডারেল এবং গণতান্ত্রিক দেশে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় ভারসাম্যের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তাই ২০০ এবং ২০১ অনুচ্ছেদের অধীনে কোনও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অনুমোদন দেওয়ার ধারণা থাকতে পারে না।
প্রশ্ন-৬ : অনুচ্ছেদ ২০১ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির বিবেচনাধীনে নেওয়া সিদ্ধান্ত কি আদালতের বিচারাধীন হতে পারে ?
উত্তর-৬ : রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তও বিচারযোগ্য নয়। যেমন, রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত মেরিট-ভিত্তিক বিচারযোগ্য নয়, তেমনই রাষ্ট্রপতির ২০১ ধারার অধীনে দেওয়া সিদ্ধান্তও বিচারযোগ্য নয়।
প্রশ্ন-৭ : রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কোনও সময়সীমা সংবিধানে নেই। আদালত কি রাষ্ট্রপতির জন্যও সময়সীমা বা পদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারে ?
উত্তর-৭ : রাষ্ট্রপতির কাজেও আদালত সময়সীমা বেঁধে দিতে পারে না। রাষ্ট্রপতির উপর কোনও বিচার্য সময়সীমা চাপানো যাবে না। ঠিক যেমন রাজ্যপালের ক্ষেত্রেও যাবে না।
প্রশ্ন-৮ : কোনও বিল রাজ্যপাল রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠালে রাষ্ট্রপতি কি বাধ্য যে অনুচ্ছেদ ১৪৩ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামত চাইবেন ?
উত্তর-৮ : রাজ্যপাল কোনও বিল রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠালে রাষ্ট্রপতি আদালতের মতামত চাইতে বাধ্য নন। তিনি নিজের বিবেচনাতেই সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। শুধুমাত্র অস্পষ্টতা থাকলে বা প্রয়োজন মনে করলে ১৪৩ ধারা ব্যবহার করতে পারেন।
প্রশ্ন-৯ : রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত (অনুচ্ছেদ ২০০ ও ২০১) বিল আইন হওয়ার আগেই আদালত কি সেই সিদ্ধান্ত বা বিলের বিষয়বস্তু পরীক্ষা করতে পারে ?
উত্তর-৯ : বিল আইন হওয়ার আগে রাজ্যপাল বা রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালত বিচার করতে পারবে না। বিল আইন হওয়ার আগে তার বিষয়বস্তু নিয়ে আদালত কোনও বিচার করবে না। ১৪৩ ধারায় মতামত দেওয়া বিচারপ্রক্রিয়া নয়, এটি আলাদা।
প্রশ্ন-১০ : সুপ্রিম কোর্ট কি অনুচ্ছেদ ১৪২ ব্যবহার করে রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের সাংবিধানিক ক্ষমতাকে কোনও ভাবে প্রতিস্থাপন করতে পারে ?
উত্তর-১০ : ১৪২ ধারা ব্যবহার করে ‘ডিমড অ্যাসেন্ট’ ঘোষণা করা যাবে না। আদালত কখনওই রাজ্যপাল বা রাষ্ট্রপতির জায়গায় সিদ্ধান্ত নিয়ে দিতে পারে না। ‘ডিমড অ্যাসেন্ট’ (সময় পেরুলে আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস) সংবিধানে নেই।
প্রশ্ন-১১ : রাজ্য বিধানসভার তৈরি কোনও আইন কি রাজ্যপালের সম্মতি ছাড়া ‘আইন’ হিসাবে কার্যকর হতে পারে ?
উত্তর-১১ : রাজ্যপালের সম্মতি ছাড়া কোনও বিল আইন হতে পারে না। রাজ্য আইনসভা পাশ করলেও রাজ্যপালের সম্মতি ছাড়া সেই আইন কার্যকর নয়।
যে ৩টি প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি…..
প্রশ্ন-১২ যখন কোনও মামলায় সংবিধান ব্যাখ্যার গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে তখন কি বাধ্যতামূলক ভাবে সুপ্রিম কোর্টকে পাঁচ বা তার বেশি বিচারপতির বেঞ্চে পাঠাতে হবে (অনুচ্ছেদ ১৪৫(৩)) ?
প্রশ্ন-১৩ : অনুচ্ছেদ ১৪২ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কি কেবল প্রক্রিয়াগত বিষয়ের জন্য, না কি কোর্ট এমন আদেশ দিতে পারে যা সংবিধান বা প্রচলিত আইনবিধির সঙ্গে বিরোধী ?
প্রশ্ন-১৪ : সংবিধান কি বলে যে কেন্দ্র–রাজ্যের বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র উপায় অনুচ্ছেদ ১৩১ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টে মামলা করা ? অন্য কোনও উপায়ে কি এই বিরোধ আদালত মেটাতে পারে না ?
বিধানসভায় পাশ হওয়া বিলে সম্মতি দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যপালের জন্য যে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। এদিন তা খারিজ করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ বলেছে, তামিলনাড়ুর মামলায় ২০০ অনুচ্ছেদের অধীনে রাজ্যপালের উপর সময়সীমা আরোপ করা ভুল ছিল।
