তরুণদের কথা শোনা উচিত
সিজেপির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার জামিনের শুনানির সময় দিল্লির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কোনো দেশের নাম না করে বিদেশের ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। অর্থাৎ ইউরোপে তরুণদের বিক্ষোভে যে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে, সেরকমই কী এ দেশেও তরুণদের বিক্ষোভের ফলে একটা অশনিসংকেত দেখা দিচ্ছে ? প্রশ্নটা এক্কেবারেই কাল্পনিক নয়। বিশ্বজুড়ে যে একটা জেনারেশন গ্যাপ দেখা দিয়েছে তা বলাইবাহুল্য। তাই, এই বিক্ষোভগুলোকে শান্তির প্রতি হুমকি হিসেবে গণ্য করাটা ঠিক হবে না। যুগ যুগ ধরে যে বাঁধাধরা রীতিনীতিতে আটকে পড়েছে সমাজ, শাসন, অর্থনীতি, উন্নয়নের ধ্যানধারণা- তাকে যুগোপযোগী করে তোলার সময় এসেছে। কিন্তু তার জন্য যে আধুনিক মানসিকতা প্রয়োজন, যে স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থপানার প্রয়োজন তার পরিচালনা করবে কারা, এটাও একটা বড় প্রশ্ন। কারণ, যেসব ত্রুটি সংশোধনের বিষয়ে ইউরোপ ও ভারত—উভয় জায়গাতেই তরুণরা সরব হয়েছে, পথে নেমেছে, তাদের প্রতিবাদ গণ আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে তার সমাধানে এগিয়ে আসার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না কোনো দেশেই। অথচ, তাদের কথা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শোনা অত্যন্ত জরুরি।
ফ্রান্সে শিক্ষার মান নিম্নগামী হয়ে পড়ায় তার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা দ্রুতই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে উত্তাল আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত মূলত শান্তিপূর্ণ থাকা এই বিক্ষোভ ক্রমেই হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে কয়েকটি শহরে। ফরাসি পুলিশ হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও আলবেনিয়াতেও অর্থনৈতিক উদ্বেগকে কেন্দ্র করে একই ধরনের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ইউরোপের এই অস্থিরতার পাশাপাশি ভারতেও নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তরুণদের বড় ধরনের বিক্ষোভ চলছে। যদিও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের নামে অগ্নিসংযোগ, সহিংসতা বা দাঙ্গাকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। তবুও ইউরোপ ও ভারতের সরকার এবং তাদের সমর্থকরা প্রায় সহজাতভাবেই দাবি করার চেষ্টা করছেন যে, এসব বিক্ষোভের পেছনে বিরোধী দলের কোনো অংশের পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। আরও খারাপ বিষয় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এমন ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে, ইউরোপে এসব সংঘাতের জন্য অভিবাসীরাই দায়ী। এ ধরনের ব্যাখ্যা হয়তো স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু এগুলো আসলে সেই গভীর সংকটগুলোর প্রতি ইচ্ছাকৃত অন্ধত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়, যা বিক্ষোভের এই ঢেউয়ের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে।
বিশেষ করে ফ্রান্স এবং ভারত, উভয় জায়গাতেই নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। একে গণতান্ত্রিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে গণ্য করা উচিত। একেবারেই নিন্দা করার বিষয় হিসেবে নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদের কারণ ভিন্ন ভিন্ন হলেও, বর্তমানে রাস্তায় যে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে একটি অভিন্ন বিষয়। যা হল- জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য নেই। মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে গত দুই দশকে শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারি বিনিয়োগও কমেছে। ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপে সরকারগুলোর পক্ষে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা খুবই সীমিত। ভারতে হয়তো ইউরোপের মতো অত সমস্যা নেই, তবে এখানে অন্য ধরনের গভীর সংকট রয়েছে। যেমন, ক্রমবর্ধমান তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব। তাই, ইউরোপ হোক বা ভারত—সাম্প্রতিক প্রতিবাদগুলোর পেছনে একটি সাধারণ সুর কাজ করছে। তরুণরা মনে করছে, তাদের কথা কেউ শুনছে না। তাদের কেবল ভবিষ্যতের অংশীদার করলেই হবে না, বরং ভবিষ্যৎ গড়ার প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগও দিতে হবে। এই প্রতিবাদগুলোকে শান্তির প্রতি হুমকি হিসেবে দেখাটা হবে একটি ভুল। ইউরোপ ও ভারত উভয় দেশেই তরুণরা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো সংশোধনের চেষ্টা করছে। তাদের কণ্ঠস্বর শোনা জরুরি।