নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: ফের মর্মান্তিক বাঘের হামলার ঘটনা সুন্দরবনে। রুটি-রুজির সন্ধানে জঙ্গলের নদীখাঁড়িতে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের কবলে পড়ে প্রাণ হারালেন এক মৎস্যজীবী। মৃতের নাম গোপাল ঢালি , বয়স ৪৫। এই ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, আতঙ্কিত স্থানীয় মানুষ।
জানা গিয়েছে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঝড়খালি ৪ নম্বর এলাকার বাসিন্দা গোপাল ঢালি পেশায় মৎস্যজীবী ছিলেন। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে পরিবার চালাতেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার পেটের টানে তিনি প্রতিবেশী সুমন মণ্ডল ও আরও এক মৎস্যজীবীর সঙ্গে সুন্দরবনের জঙ্গল সংলগ্ন নদীখাঁড়িতে কাঁকড়া ধরতে যান। অন্যান্য দিনের মতো সোমবার বিকেলেও তাঁরা দেউলভারানী জঙ্গল সংলগ্ন নদীখাঁড়িতে জাল ফেলছিলেন।
ঠিক সেই সময় আচমকা জঙ্গল থেকে একটি বাঘ বেরিয়ে আসে। তিনজনই তখন নদীখাঁড়িতে কাঁকড়া ধরায় ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎই বাঘটি গোপাল ঢালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁর ঘাড়ে কামড় বসায়। এরপর তাঁকে টানতে টানতে গভীর জঙ্গলের দিকে নিয়ে যেতে থাকে।
এই দৃশ্য দেখে সঙ্গী দুই মৎস্যজীবী গোপালকে উদ্ধার করতে বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন। দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে মানুষ ও বাঘের মধ্যে সংঘর্ষ। বাঘ শিকার ছাড়তে নারাজ ছিল এবং হুঙ্কার দিয়ে বারবার তাঁদের আক্রমণের চেষ্টা করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে প্রাণ বাঁচাতে পিছু হটতে বাধ্য হন তাঁরা। বাঘ তখন গোপাল ঢালির দেহ টেনে নিয়ে যায় গভীর অরণ্যে।
তবে সঙ্গী দুই মৎস্যজীবী হাল ছাড়েননি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তাঁরা বাঘের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে সঙ্গীর খোঁজে বের হন। কিছু দূর এগোতেই জঙ্গলের ভিতরে গোপাল ঢালির নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখতে পান তাঁরা। কোনোরকমে দেহটি উদ্ধার করে নৌকায় তোলা হয় এবং রাতেই দাঁড় বেয়ে ঝড়খালি গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরে মৃতদেহ বাসন্তী থানায় নিয়ে যাওয়া হলে মঙ্গলবার সকালে পুলিশ দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে বাসন্তী থানার পুলিশ।
এদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী মণিকা, ১৯ বছরের মেয়ে মঞ্জু ও ১০ বছরের ছেলে বাবু। কান্নায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন স্ত্রী ও সন্তানরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সুন্দরবনের জঙ্গল এলাকায় বাঘের উপদ্রব ক্রমেই বাড়ছে। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন বহু মানুষ জীবন হাতে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁদের দাবি, এই ধরনের ঘটনা বন্ধ করতে প্রশাসনের তরফে আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, সুন্দরবন এলাকায় প্রায়শই এই ধরনের বাঘের হামলার ঘটনা ঘটছে। রুটি-রুজির টানে জঙ্গলে ঢুকে প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের ভাষায়, সুন্দরবনে যেন শুরু হয়েছে একের পর এক মৃত্যুমিছিল।
