তাপস মহাপাত্র
একেই বলে তাক লাগানো। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মঞ্চে হাজির বিশ্বের তাবড় তাবড় রাষ্ট্রনায়কের কাছে এই মুহূর্তে তিনি এক বিস্ময়, দৃঢ়চেতা এবং দুঁদে কূটনীতিক। তাঁর নাম- পেটাল গেহলট। জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশনের প্রথম সচিব তিনি। পাক প্রধানমন্ত্রী বোধ হয় স্বপ্নেও ভাবেননি এভাবে আন্তর্জাতিক মহলে তাঁকে অপদস্থ হতে হবে। যেভাবে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফকে কার্যত সহবত শেখালেন, তা তো তাজ্জব হওয়ার মতোই। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে যে ভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে অপারেশন সিন্দুর এবং দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে উত্তেজনা নিয়ে শরীফের দাবি খারিজ করে দিলেন, তাতে আন্তর্জাতিক মহলের ঘাড় না ঘুরিয়ে উপায় ছিল না। তাঁর সাফ কথা, “পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফের সন্ত্রাসবাদকে মহিমান্বিত করেছেন।” বস্তুত, ভারত পাকিস্তান সংঘর্ষ প্রসঙ্গে পাক প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যে যে দ্বিচারিতা উঠে এসেছে তাকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘আদিখ্যেতার বিনিময়ে মুখশুদ্ধি’ ছাড়া আর কী বা বলা যায়। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে যে ভাষায় একজন মহিলা কূটনীতিক পাক প্রধানমন্ত্রীর মুখের উপর প্রত্যুত্তর দিলেন তাতে যেন মুখিয়ে উঠল আন্তর্জাতিক মহল।
পেটাল গেহলট একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক যিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অনুবাদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশনে প্রথম সচিব হিসেবে যোগদান করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি রাষ্ট্রসংঘে উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। এর আগে গেহলট ২০২০-র জুন থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ইউরোপীয় পশ্চিম বিভাগে আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তিনি প্যারিস এবং সান ফ্রান্সিসকোতে ভারতের মিশনেও নিযুক্ত ছিলেন।

পেশাগত সাফল্যের বাইরেও, গাহলট একজন উৎসাহী সঙ্গীতশিল্পী। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে প্রয়শই গিটার বাজানোর ভিডিও শেয়ার করতে দেখা যায়। বেশ পাকাপোক্ত হাত এবং সুরজ্ঞানও। তিনি মুম্বাইয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং ফরাসি সাহিত্যে স্নাতক। তারপর দিল্লির লেডি শ্রী রাম কলেজ ফর উইমেন থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তরের পাঠ শেষ করেন।। এরপর তিনি আমেরিকার মন্টেরেতে মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ থেকে ভাষা ব্যাখ্যা এবং অনুবাদে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান।
রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় তাঁর উপর বক্তব্য রাখার দায়িত্ব বর্তালে তিনি সমহিমায় মঞ্চে এসে দাঁড়ান। ভারত পাক সংঘর্ষ নিয়ে পাক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে নস্যাৎ করতে তিনি তুলে ধরেন বাস্তব চিত্র। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলিকে আশ্রয় দেওয়ার এবং পরাজয়কে বিজয় হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টাকে কার্যইত ধূলিস্যাৎ করে দেন। রাষ্টসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি দ্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, সংঘর্ষ বিরতির জন্য অনুরোধ এসেছিল পাক সামরিকবাহিনী থেকে। সেই সঙ্গে স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেন, “দেশের ধ্বংসপ্রাপ্ত রানওয়ে এবং পুড়ে যাওয়া হ্যাঙ্গারগুলি দেখে যদি পাক প্রধানমন্ত্রী তাকে জয় ভাবেন, তাহলে তিনি তা উপভোগ করুন।” তিনি বলেন, পহেলগাঁও জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নাগরিকের হত্যার পেছনে থাকা গোষ্ঠী দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টকে কী ভাবে মদত দিচ্ছে পাকিস্তান। সেইসঙ্গে তিনি সন্ত্রাসবাদ রপ্তানির জন্য সরাসরি ইসলামাবাদকে অভিযুক্ত করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন কীভাবে সন্ত্রাসবিরোধী জোটে থেকেও তারা এক দশক ধরে ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছিল। একইসঙ্গে তাঁর সাফ কথা, পাকিস্তানের সঙ্গে সমস্ত অমীমাংসিত সমস্যা দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধান করতে হবে, এক্ষেত্রে কোনও তৃতীয় পক্ষের কোনও স্থান নেই। পাক প্রধানমন্ত্রীকে তিনি স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেন, পাকিস্তানকে প্রথমে সমস্ত সন্ত্রাসবাদী শিবির ভেঙে ওয়ান্টেড জঙ্গিদের ভারতের হাতে তুলে দিতে হবে, তারপর অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আলোচনা।
