
নয়ন বিশ্বাস রকি
আজ প্রমাণ হয়ে গেল, বিএনপির হাতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব মোটেও নিরাপদ নয়। মহেশখালীকে নিয়ে যে খেলা শুরু হয়েছে, তাতে পরিষ্কার – বাংলাদেশকে আর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নয়, দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চায় একটি মহল।
মহেশখালী শুধু একটি দ্বীপ নয়। এটি বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের হৃদপিণ্ড। এখানে রয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনাল, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ কেন্দ্র – যা শেখ হাসিনার স্বপ্নের উন্নয়নের প্রতীক। কিন্তু আজ সেই মহেশখালীকেই বিদেশি শক্তির কাছে ইজারা দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে।
সূত্র বলছে, চিনকে ঠেকানোর জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে চায় আমেরিকা। তাদের ভাষায় “Indo-Pacific Strategy”। আর এই স্ট্র্যাটেজির কেন্দ্রবিন্দু হল বঙ্গোপসাগর। মহেশখালীতে তারা একটি “লজিস্টিক সুবিধা” চায়। শুনতে নিরীহ মনে হলেও এর মানে হল- সামরিক ঘাঁটি। এখানে তাদের যুদ্ধজাহাজ ভিড়বে, নজরদারি বিমান উড়বে, রাডার বসবে। আর উদ্দেশ্য একটাই – চিনকে ঘিরে ফেলা। এই প্রস্তাব ১০ বার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, “বাংলাদেশ কারো সামরিক জোটে যাবে না। আমরা সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতায় নেই।” এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি।
কিন্তু আজ ? ইউনুস-বিএনপির তথাকথিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আমেরিকার সাথে গোপন বৈঠক, গোপন চুক্তি। দেশের মানুষ জানে না, কী দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমেরিকা চায় চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) ঠেকাতে। আর বাংলাদেশ হল সেই রোডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদি মহেশখালী আমেরিকা পায়, তাহলে চিন বঙ্গোপসাগরে অবরুদ্ধ হয়ে যাবে। তাহলে কী হবে? চিন নিশ্চয়ই চুপ করে থাকবে না। তারা মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দরকে সামরিকীকরণ করবে। ভারত তার নৌবাহিনী বাড়াবে। আর বঙ্গোপসাগর হবে আমেরিকা-চিন-ভারতের ত্রিমুখী লড়াইয়ের ময়দান।
একসময় বঙ্গোপসাগর ছিল শান্তির সাগর। শেখ হাসিনা একে “ব্লু-ইকোনমি” বা সমুদ্র অর্থনীতির কেন্দ্র বানিয়েছিলেন। আজ সেই সাগরকেই বানানো হচ্ছে আন্তর্জাতিক যুদ্ধের প্রাণকেন্দ্র। যদি এখানে যুদ্ধজাহাজের মহড়া শুরু হয়, তাহলে কী হবে ? আমাদের জেলেরা মাছ ধরতে পারবে না। আমাদের বাণিজ্যিক জাহাজ চলতে পারবে না। আমাদের কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন পর্যটন ধ্বংস হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় কথা – আমরা স্বাধীনভাবে চলতে পারব না।
আজ প্রমাণ হয়ে গেল, বিএনপির কাছে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত নয়। ২০০১-২০০৬ সালে তারেক রহমান হাওয়া ভবন বানিয়ে আমেরিকার কাছে দেশ বিক্রির চুক্তি করেছিল। গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়েছিল। আবার সেই একই খেলা শুরু হয়েছে। তারা ক্ষমতায় থাকার জন্য যে কোনো কিছু দিতে রাজি। আজ মহেশখালী দেবে, কাল সেন্টমার্টিন দেবে, পরশু পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশি ঘাঁটি বসাবে। তাদের কাছে ক্ষমতাই বড়, দেশ নয়। শেখ হাসিনা কখনো দেশের এক ইঞ্চি মাটি ছাড়েননি। তিনি মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা জয় করেছেন, ভারতের সাথে ছিটমহল বিনিময় করেছেন কিন্তু দেশ বিক্রি করেননি। আর বিএনপি ক্ষমতায় এলেই দেশ বিক্রির বাজারে বসে। আগে শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ ছিল সবার বন্ধু। ভারত, চীন, রাশিয়া, আমেরিকা – সবাই আমাদের সম্মান করত। আমরা কারো তাঁবেদার ছিলাম না। আমরা মাথা উঁচু করে চলতাম। আর এখন ? বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে “ভূ-রাজনৈতিক ভাড়াটে রাষ্ট্র”। আমরা আজ আমেরিকার চাপে, কাল চিনের ঋণের ফাঁদে, পরশু আইএমএফের শর্তে দিশেহারা। আগে বঙ্গোপসাগরে আমরা মাছ ধরতাম, এখন সেখানে যুদ্ধজাহাজের মহড়া হবে। আগে মহেশখালীতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতো, এখন সেখানে সামরিক রাডার বসবে। এই কি স্বাধীনতা ? ৩০ লাখ শহীদের রক্ত দিয়ে কি আমরা এই জন্য দেশ স্বাধীন করেছিলাম যে, বিদেশিরা আমাদের দ্বীপ ব্যবহার করবে ? সময় এসেছে জেগে ওঠার। মহেশখালী আমাদের, বঙ্গোপসাগর আমাদের। এই দেশ কারো দাবার ঘুঁটি হবে না।
লেখক বাংলাদেশের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজকর্মী