ওঙ্কার ডেস্ক : নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক সাংসদ গোপন ব্যালটের মাধ্যমে উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেন। এর অর্থ সাংসদরা তাদের ইচ্ছামত ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা রাখেন। তবে বাস্তবে, ভোট মূলত যে যার দলের ভিত্তিতে হয়ে থাকে। তাই অঙ্ক বলে মঙ্গলবার উপরাষ্ট্রপতি পদে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের মনোনীত প্রার্থী সিপি রাধাকৃষ্ণণই জিতছেন। তবে জয়ের ব্যবধান কমতে পারে, এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। যদিও এই নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক বিজেপি। তাদের প্রতিটি ভোটের উপর দলের তরফে নজর রাখা হচ্ছে। কারণটা সেই গোপন ব্যালট এবং ক্রস-ভোটিং।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালে জগদীপ ধনখড় উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জিতেছিলেন। ফলে পরিস্নগখ্যান থেকে বোঝা যায় সেবার ক্রস-ভোটিং হয়েছিল। এর মধ্যে ওয়াইএসআর কংগ্রেস এবং তৎকালীন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েকের বিজু জনতা দলের ভোটও ছিল। ধনখড় প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। এবারও তাই ক্রস-ভোটিং-এর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাছে না।
এবারের উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হিসেবটা একবার দেখে নেওয়া যাক। বর্তমানে রাজ্যসভার ২৩৯ জন সাংসদ এবং লোকসভার ৫৪২ জন সাংসদ রয়েছেন, যাদের সকলেই ভোট দেওয়ার যোগ্য। এর ফলে ভোটার সংখ্যা ৭৮১। ফলে যিনি ৩৯১ বা তার বেশি ভোট পাবেন তিনিই জিতবেন। এই অবস্থায় এনডিএ-র ৪২৫ জন সাংসদ রয়েছে। তাই কাগজে কলমে বিজেপির মনোনীত মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল সিপি রাধাকৃষ্ণণ স্পষ্ট বিজয়ী।
শোনা যাচ্ছে, ২০২২ সালের মতো আনুষ্ঠানিক জোটের বাইরে থেকে সমর্থন পাওয়ার ব্যাপারেও আত্মবিশ্বাসী এনডিএ। ইতিমধ্যেই জানা গেছে জগন রেড্ডির ওয়াইএসআর কংগ্রেস রাধাকৃষ্ণণকে সমর্থন করেছে। ওয়াইএসআরসিপির ১১ জন সাংসদ রয়েছে – রাজ্যসভায় সাতজন এবং লোকসভায় চারজন। এছাড়া, বিআরএস-এর ৪ জন সাংসদ এবং বিজেডি-র ৭ জন সাংসদ কি করবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে দলের প্রধান কেসিআরের কন্যা কে কবিতার পদত্যাগ এবং বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সম দূরত্ব বজায় রাখার কারণে বিআরএস ভোটদানে বিরত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত জুন মাসে মারা যাওয়া মাগন্তী গোপীনাথ মারা যাওয়ায় তাঁর জুবিলি হিলস বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন। তাই বিআরএস এই উপনির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। এখানে মুসলিম ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০১৮ এবং ২০২৩ সালে এই আসন থেকে জয়লাভ করেছিলেন মাগন্তী গোপীনাথ।
বিজেডি সমর্থন দেবে বলে আশা করা হচ্ছে তবে এটি নিশ্চিত করা হয়নি। এখনও পর্যন্ত যা ইংগিত মিলেছে তাতে গত বছরের বিধানসভা নির্বাচনে যে দলটি তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিল তাদের সমর্থন করার বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিজেডি। তবুও, বিআরএস এবং বিজেডি ছাড়া, এনডিএ ৪৩৬ ভোট পাচ্ছে, অন্তত বর্তমান হিসেব তাই বলছে। তবে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। স্বাতী মালিওয়াল আম আদমি পার্টির রাজ্যসভার সাংসদ। গত বছর আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সহযোগীর দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলার পর দল এবং এর সাংসদের মধ্যে সম্পর্ক ভেঙে যায়। শোনা গিয়েছিল যে শ্রীমতি মালিওয়াল বিজেপিতে যোগ দেবেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তিনি পদ তাঁর পদ আগলে রেখেছেন। মঙ্গলবারের নির্বাচনের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় ইভেন্ট হয়ে উঠতে পারে। এছাড়াও লোকসভায় সাতজন স্বতন্ত্র সাংসদকে নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আকালি দল এবং মিজোরাম থেকে জেডপিএম-কে নিয়ে একই রকম অনিশ্চয়তা ঘুরপাক খাচ্ছে, যাদের প্রত্যেকেরই একজন করে সাংসদ।
যদি প্রতিটি ভোট রাধাকৃষ্ণাণের পক্ষে যায়, তাহলে বিজেপির প্রার্থী ৪৫৮ ভোট পেতে পারেন, যা তিন বছর আগে ধনখড়ের ৫২৮ ভোটের চেয়ে অনেক কম হলেও জয় নিশ্চিত বপলে মনে করা হচ্ছে।
এবার ২০২৫ সালের উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থানটা দেখে নেওয়া যাক। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল ইন্ডিয়া ব্লক উপরাষ্ট্রপতি পদে তাদের প্রার্থী করেছেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বি সুদর্শন রেড্ডিকে। সংসদের উভয় কক্ষ মিলিয়ে এই মুহূর্তে বিরোধী দলের ভোট- ৩২৪টি। গত লোকসভা নির্বাচনে বিরোধী দলের সদস্য সংখ্যা বাড়লেও সেই সংখ্যা এতটাই নয় যে এই উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তারা সরকার পক্ষকে বেগ দিতে পারে। যদি ১০০ শতাংশ বিরোধী সাংসদ বিচারপতি বি সুদর্শন রেড্ডির পক্ষে ভোট দেন, তবুও তিনি রাধাকৃষ্ণণের চেয়ে ১০০ থেকে ১৩৫ ভোট কম পাবেন। যদি বিআরএস এবং বিজেডি ঘুরে দাঁড়ায়, এমন কি স্বাতী মালিওয়াল, সমস্ত নির্দল সাংসদ এবং একক এমপি দল, ওয়াইএসআর কংগ্রেসও ইন্ডিয়া জোটের প্রার্থীকে ভোট দেয় তাহলেও চিত্রটা বদলাচ্ছে না। কারণ তাতেও ইন্ডিয়া জোট প্রায় ৭০ ভোট কম পাবে। ইন্ডিয়া ব্লক ইতিমধ্যেই স্বীকার করেছে যে তারা এই নির্বাচনে জয়লাভের আশা করে না। তবুও, এই বাস্তবিক অঙ্কতেও খানিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কারণ হিসেবে উঠে আসছে রাজ্যসভার নাটকীয় পরিণতির সম্ভাবনা। যেখানে ১৫০টি ক্রস-ভোটের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
