নিজস্ব প্রতিনিধি, বীরভূম: বাম আমলের রাজনৈতিক আতঙ্কের স্মৃতি উসকে দিল নানুরের ঘটনা। বিধানসভা নির্বাচনের মুখে ফের রাজনৈতিক উত্তেজনায় উত্তাল বীরভূম। বুধবার সকালে নানুর বিধানসভার বাসাপাড়া অঞ্চলের কুরগ্রামে বিজেপির কুরগ্রাম মণ্ডল সভাপতি রামকৃষ্ণ মণ্ডলের বাড়ির সামনে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি সাদা থান, ব্যাগভর্তি রজনীগন্ধার মালা, মিষ্টির প্যাকেট ও ধূপকাঠি রেখে যায় বলে অভিযোগ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়।
এই ঘটনার পর রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে বীরভূমে। বিজেপির পক্ষ থেকে নিশানা করা হয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে। বিজেপির দাবি, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এলাকায় বিজেপির সংগঠন শক্তিশালী হওয়ায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, এই ধরনের প্রতীকী ‘হুমকি’ দিয়ে কর্মীদের মনে ভয় ধরানোই উদ্দেশ্য। অন্যদিকে, অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের নেতাদের বক্তব্য, বিজেপি নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়াতে এবং সংবাদ শিরোনামে আসার জন্যই এই ধরনের নাটক সাজাচ্ছে। তৃণমূলের দাবি, ঘটনার সঙ্গে দলের কোনও যোগ নেই।
তবে এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই শেষ নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ বলছেন, সাদা থান, ফুলের মালা ও ধূপকাঠি রেখে যাওয়ার ঘটনায় তাঁদের মনে পড়ে যাচ্ছে বাম আমলের সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা, যখন বিরোধী কর্মীদের বাড়ির সামনে এই ধরনের প্রতীকী ‘বার্তা’ রেখে ভয় দেখানো হতো।
বামফ্রন্ট শাসনামলে বিশেষ করে গ্রামবাংলায় বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে চাপে রাখার জন্য এ ধরনের ঘটনার নজির ছিল। বিরোধী নেতাদের বাড়ির সামনে সাদা কাপড়, চন্দন, ফুলের মালা রেখে যাওয়া হতো—যা কার্যত মৃত্যুর পূর্বাভাস বা সামাজিক বয়কটের ইঙ্গিত হিসেবেই ধরা হতো। সে সময় বহু ক্ষেত্রেই বিরোধী কর্মীরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হতেন। স্থানীয় প্রবীণদের কথায়, ‘বাম আমলে আমরা এমন ঘটনা বহু বার দেখেছি। কারও বাড়ির সামনে এই জিনিস রেখে গেলে বুঝে নিতে হতো—সে রাজনৈতিকভাবে টার্গেট হয়ে গিয়েছে।’ এই প্রেক্ষাপটে বিজেপির দাবি, বর্তমান শাসকদল সেই পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই নতুন রূপে ফিরিয়ে আনতে চাইছে। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, “এটা নিছক কৌতুক নয়, এটা পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা। বাম আমলের মতো বিরোধী কণ্ঠ রোধ করার রাজনীতি আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কে বা কারা ওই সামগ্রী রেখে গিয়েছে, তা জানার চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে বীরভূমের মতো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর জেলায় এই ধরনের ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে আসন্ন ভোটপর্ব কতটা উত্তপ্ত হতে চলেছে। একদিকে বিজেপি নিজেদের সংগঠন মজবুত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে শাসকদল নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে এই ধরনের প্রতীকী সংঘাতের রাজনীতি ফের সামনে আসছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
সব মিলিয়ে, কুরগ্রামের এই ঘটনা শুধুই একটি বাড়ির সামনে কিছু সামগ্রী পড়ে থাকার বিষয় নয়। এটি বাম আমলের রাজনৈতিক ভয়ের সংস্কৃতির স্মৃতি ফিরিয়ে এনে বর্তমান রাজনীতির দিকেই বড় প্রশ্ন তুলে দিল—রাজনৈতিক লড়াই কি আবারও আতঙ্কের পথেই ফিরছে?
প্রকৃত সত্য কী, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। তবে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বীরভূম জেলার রাজনীতিতে উত্তাপ যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
