ওঙ্কার ডেস্ক, অর্ঘ পাত্র: বাংলায় প্রথম বারের মত বিজপি এসেছে সরকারে। ভোটের আগে থেকেই বিজেপির দাবি, তাঁরা তাদের সরকার নবান্ন থেকে নয় মহাকরণ থেকে চলবে। সেই মত বিধানসভাতে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভের পর ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। পশ্চিম বঙ্গ দিবস নিয়ে এক্স হ্যান্ডেলে মোদি লেখেন, “এই দিনটি এমন এক রাজ্যকে উদযাপন করে যা সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প, আধ্যাত্মিকতা, বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও ব্যবসা, সমাজ সংস্কার এবং আরও অনেক বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্রে তার অবদানের মাধ্যমে ভারতের ইতিহাসকে রূপদান করেছে। বারবার, অগণিত ভাবে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের জাতীয় চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ২০ জুন দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনেই নিশ্চিত করা হয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি অংশ হিসেবেই থাকবে। এর পেছনে ছিল ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর অমূল্য অবদান। ২০২৬ সালে, আমরা ড. মুখার্জীর ১২৫তম জন্মজয়ন্তীও পালন করছি। জনগণের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে। আমি পশ্চিমবঙ্গের অগ্রগতি এবং পশ্চিমবঙ্গবাসীর সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করছি।” প্রসঙ্গত, দু’দিনের সফরে শনিবার রাজ্যে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উপলক্ষ তারকেশ্বরে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন এবং কলকাতায় রেড রোডে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মূল অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া। পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপনে শনিবার বিকেলে তারকেশ্বরে এক ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশাসনিক বৈঠকের পাশাপাশি তারকেশ্বরের বালিগড়িতে সভা করবেন। মোদি পশ্চিমবঙ্গে ৮২০ কোটি টাকারও বেশি বিশাল পরিকাঠামো প্যাকেজের মাধ্যমে এক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের সূচনা করতে চলেছেন। এছাড়াও রয়েছে প্রায় ৫৯০ কোটি টাকার রেল সংস্কার প্রকল্প। রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা ও ধনধান্য যোজনার মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু করবেন। পিএম কিষান প্রকল্পের পরবর্তী কিস্তির অর্থও বিলি করবেন। কৃষি, গ্রামোন্নয়ন, মৎস্য এবং পশুপালন ক্ষেত্রে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং শিলান্যাস করবেন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাগেরও ঘোষণা করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু বাংলার হিন্দু-প্রধান অংশের কাছে সুযোগ ছিল ভারতে জুড়ে যাওয়ার। এরজন্য তৎকালীন বঙ্গীয় আইনসভার ভোটাভুটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই ভোটেই ঠিক হয়, বাংলা ভাগ হয়ে জুড়বে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। বিজেপির দাবি, ওই দিন বাংলা ভাগ না হলে, পশ্চিমবঙ্গ তৈরিই হত না। আর এই প্রদেশ জুড়ে যেত বাংলাদেশের সঙ্গে।
যদিও আগের সরকারের আমলে খোদ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসাবে মানতে রাজি ছিলেন না। আদতে তখন পশ্চিমবঙ্গের কোনও রাজ্য দিবসই ছিল না। পরবর্তীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইচ্ছানুযায়ী পয়লা বৈশাখের দিনটাকেই ঘোষণা করা হয় পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য দিবস হিসাবে। অন্যদিকে, বামেরাও এই দিনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসাবে পালন করতে রাজি নয়। তবে বিজেপি সরকারে আসতেই সরকারি ভাবেই ২০ জুন পালিত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ দিবস। এইদিকে পশ্চিমবঙ্গ শুধু একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয়, এটি বাঙালি হিন্দুর অস্তিত্বরক্ষার একটি ভাবনা। ১৯৪৭ সালে এল ভারত-ভাগের পর্ব। যুক্ত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৫% মুসলমান চেয়েছিল বাংলার পাকিস্তানে যোগদান। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট শুরু হওয়া কলকাতার বীভৎস দাঙ্গা, তারপর অক্টোবরে নোয়াখালিতে হিন্দু গণহত্যার পরে, কেউ মুসলমান-শাসিত বাংলায় থাকার কথা ভাবতেই পারেনি। এই সময় বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বাঙালি হিন্দুর ‘হোমল্যান্ড’ পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির জন্য এগিয়ে এলেন বাংলার মনীষীরা– ঐতিহাসিক ‘স্যর’ যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, ভাষাবিদ সুনীতি চট্টোপাধ্যায়, বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, মতুয়া গুরু প্রমথরঞ্জন ঠাকুর, পরবর্তী সময়ে বাংলার কংগ্রেস দল। ৪-৬ এপ্রিল, ১৯৪৭। তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত হল বাংলা বিভাজনের জন্য বিশাল হিন্দু জনসভা।
বঙ্গীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ডা. বিধানচন্দ্র রায়, ড. প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কুমার দেবেন্দ্রলাল খান-সহ প্রত্যেকেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে সমর্থন করেন। ২২ এপ্রিল ১৯৪৭, তৎকালীন বাংলার সর্বপ্রধান সংবাদপত্র ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ জনমত সমীক্ষা প্রকাশ করে, যাতে দেখা গিয়েছিল যে, ৯৮.৬ শতাংশ হিন্দু পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবিকে সমর্থন করেছিল। মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবিতে ‘হিন্দু মহাসভা’ এবং কংগ্রেসের যৌথ উদ্যোগে বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়, যার সভাপতিত্বে ছিলেন প্রবাদপ্রতিম ইতিহাসবিদ ‘স্যর’ যদুনাথ সরকার। এরপরে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবিতে সারা প্রদেশ জুড়ে ৭৬টি জনসভা হয়। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভা বাংলা ভারত বা পাকিস্তান যোগদানের প্রশ্নে একমত হল না। তখন হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে হল পশ্চিমবঙ্গ আইন সভা ও মুসলমানপ্রধান অঞ্চল নিয়ে হল পূর্ববঙ্গ আইন সভা। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গ আইনসভার সমস্ত হিন্দু সদস্য, এমনকী বামপন্থী দলেরাও পশ্চিমবঙ্গের পক্ষেই ছিলেন। ও-দিনেই পশ্চিমবঙ্গ আইনসভার সদস্যরা ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগের পক্ষে ও পাকিস্তানে যোগদানের বিপক্ষে ভোট দিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ গঠন সুনিশ্চিত করেন। এরপর ৩ জুলাই ১৯৪৭, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। হিন্দু বাঙালি নিজের অস্তিত্বের স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ স্থাপন করেছে। ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করে পশ্চিমবঙ্গকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘হিন্দু হোমল্যান্ড’ হিসাবে। এবার একটু পাতা ওলটানো যাক ইতিহাসের দিকে, ১৯৫১-র