শুক্লা মাইতি , ওঙ্কার বাংলা:
নদিয়ার কালীগঞ্জ—একটি নাম, যা গত এক বছরে শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক পরিচয় নয়, বরং এক মায়ের অন্তহীন যন্ত্রণার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এ যেন গল্প নয়, নির্মম বাস্তব। সন্তানের মৃত্যু বুকে নিয়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামা এক মায়ের লড়াই আজ নতুন রাজনৈতিক মাত্রা পেল।
২০২৫ সালের কালীগঞ্জ উপনির্বাচনের ফলপ্রকাশের দিন। গণতন্ত্রের উৎসবের সেই দিনই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে এলাকা। অভিযোগ, জয়োল্লাসে মত্ত তৃণমূল কর্মীদের বিজয় মিছিল থেকে ছোঁড়া বোমায় প্রাণ হারায় মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী তামান্না খাতুন। মুহূর্তের মধ্যে নিভে যায় একটি কচি প্রাণ, আর শুরু হয় এক মায়ের দুঃস্বপ্নের জীবন।
সেই মা—সাবিনা ইয়াসমিন। যিনি গত এক বছর ধরে শুধুমাত্র একজন মা নন, হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদের মুখ। কখনও থানার দ্বারস্থ হয়েছেন, কখনও আদালতের। কখনও রাজপথে, কখনও রাজনৈতিক নেতাদের দরজায়—একটাই দাবি, “আমার মেয়ের মৃত্যুর বিচার চাই।”
অভিযোগের আঙুল বারবার উঠেছে শাসকদলের দিকেই। এমনকি তৃণমূলের তরফে দেওয়া মোটা অঙ্কের আর্থিক সাহায্যও প্রত্যাখ্যান করেন সাবিনা। তাঁর কাছে টাকার চেয়ে বড় ছিল ন্যায়বিচার। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন—“আমার মেয়ের প্রাণের দাম টাকা দিয়ে মেটানো যাবে না, আমি দোষীদের শাস্তি চাই।”
কিন্তু সময় গড়িয়েছে, অভিযোগ উঠেছে তদন্তের গতি নিয়ে। এক বছর পেরিয়েও ন্যায়বিচার অধরা—এই ক্ষোভ, এই হতাশাই যেন নতুন মোড় নিয়েছে রাজনীতির ময়দানে।
এবার সেই সাবিনা ইয়াসমিনই বামফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি প্রার্থীপদ নয়—এটি একটি প্রতীকী বার্তা। শাসকবিরোধী শক্তি এই প্রার্থীতার মাধ্যমে তুলে ধরতে চাইছে “ন্যায়বিচার বনাম ক্ষমতা”-র প্রশ্নকে।
একদিকে শাসকদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অন্যদিকে শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করা এক মায়ের লড়াই—এই দুইয়ের সংমিশ্রণে কালীগঞ্জের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সাবিনা বলেন,
“আমি চাই শান্তিপূর্ণ ভোট হোক। ভোটের জন্য যেন আর কোনো শিশুর বা সাধারণ মানুষের গায়ে একটি আঁচড়ও না লাগে। আমি চাই না আর কোনো মা আমার মতো কষ্ট পাক।”
এই মন্তব্যেই স্পষ্ট—সাবিনার লড়াই শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, তা এখন বৃহত্তর সামাজিক বার্তায় পরিণত হয়েছে। তাঁর প্রার্থিতা একদিকে যেমন শাসকদলের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে তা গণতন্ত্রের নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের সুরক্ষার প্রশ্নকেও সামনে আনছে।
কালীগঞ্জের এই নির্বাচন তাই আর শুধুমাত্র ভোটের লড়াই নয়। এটি হয়ে উঠেছে ন্যায়বিচারের দাবি, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন এবং এক মায়ের চোখের জলের প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার, সেই চোখের জল কি শেষ পর্যন্ত ভোটবাক্সে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পায়, নাকি তা আবারও রাজনীতির কোলাহলে হারিয়ে যায়।
