শেষ প্রতিনিধি : এইচআইভি বা এইডস মহামারী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে, এই রোগে মৃত ব্যক্তিদের স্মরণ করতে এবং এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রতি বছর ১ ডিসেম্বরকে বিশ্ব এইডস দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এটি শুরু হয় ১৯৮৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে। সেই থেকে এটি সরকার, সমাজ ও মানুষের সম্মিলিত প্রয়াশে এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। এই বছরের বিষয় “কাঠিন্যের মোকাবিলা করে এইডস প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে রূপান্তরিত করা”, অর্থাৎ শুধু আগের সাফল্যের ধারাকে অব্যাহত রাখা নয়, ভবিষ্যতের জন্য এইচআইভি সেবাকে আরও স্থিতিশীল, সাম্যভিত্তিক এবং সমাজনির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। এই বিষয়টি দেখায় যে সবার কাছে চিকিৎসা ও সহায়তা পৌঁছে দিতে মহামারী, সংঘাত, বৈষম্য এবং বিভিন্ন অসমতার কারণে তৈরি হওয়া বাধাগুলি কাটিয়ে ওঠা জরুরি। ভারত প্রতি বছর বিশ্ব এইডস দিবস পালন করে ন্যাশনাল এইডস কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (নাকো) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের নেতৃত্বে দেশ জুড়ে চলে প্রচার, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং এই মারণ রোগের মোকাবিলায় সরকারি প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে।
ভারতের এইডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি অন্তর্জাতিক স্তরে সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃত। প্রথম পর্যায় (১৯৮৫–১৯৯১)–এ মূলত এইচআইভির সংক্রমণ শনাক্ত করা, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করা এবং লক্ষ্য-ভিত্তিক প্রচারের ওপর জোর দেওয়া হয়। এরপর ন্যাশনাল এইডস অ্যান্ড এসটিডি কন্ট্রোল প্রোগ্রাম (এনএএসপি) এবং ন্যাশনাল এইডস কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (নাকো)–র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কর্মসূচি সামগ্রিক রূপ পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এনএএসপি–র কাজ কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার পরিবর্তে জেলা ও স্থানীয় স্তরে আরও বিকেন্দ্রীভূত হয় এবং এনজিও ও এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।
এটি প্রকাশ পেয়েছে পাঁচটি পর্যায় :
এনএএসপি–I (১৯৯২–১৯৯৯)
ভারতের প্রথম সমন্বিত এইচআইভি বা এইডস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি।
লক্ষ্য- সংক্রমণ হ্রাস এবং অসুস্থতা ও মৃত্যুহার হ্রাস করা।
এনএএসপি–II (১৯৯৯–২০০৬)
ভারতে এইচআইভি ছড়িয়ে পড়া হ্রাস করা এবং এইডস মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানো।
এনএএসপি–III (২০০৭–২০১২)
২০১২ সালের মধ্যে মহামারি থামানো এবং সংক্রমণ কমানো। তার জন্য উচ্চ ঝুঁকির গোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ বাড়ানো। সেইসঙ্গে সেবা, সহায়তা ও চিকিৎসাকে একত্রিত করা। জেলাভিত্তিক সমন্বয়ের জন্য ডিস্ট্রিক্ট এইডস প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল ইউনিটস (ড্যাপকু), যেখানে বৈষম্য সংক্রান্ত অভিযোগও নথিভুক্ত করা হয়।
এনএএসপি–IV (২০১২–২০১৭)
সংক্রমণের হার হ্রাস করা এবং একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ২০০৭ সালের তুলনায় নতুন সংক্রমণের হার ৫০ শতাংশ কমানো এবং এইচআইভি আক্রান্ত সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ সেবা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা।ইডস নির্মূলের জাতীয় লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করতে এটি ২০১৭–২০২১ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
এ সময়ের প্রধান উদ্যোগগুলি হল এইচআইভি বা এইডস (প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল) আইন, ২০১৭, যা বৈষম্য নিষিদ্ধ করে, গোপনীয়তা রক্ষা করে এবং পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য সম্মতি বাধ্যতামূলক করে। একইসঙ্গে চিকিৎসা থামিয়ে দেওয়া রোগীদের পুনরায় সেবার আওতায় আনা।‘টেস্ট অ্যান্ড ট্রিট’ নীতি– শনাক্ত হওয়া প্রতিটি রোগীর জন্য তৎক্ষণাৎ এআরটি শুরু। রুটিন ইউনিভার্সাল ভাইরাল লোড পরীক্ষা।
এনএএসপি–V (২০২১–২০২৬)
১৫,৪৭১.৯৪ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় প্রকল্প শুরু।অতীতের অর্জন ধরে রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে এইচআইভি বা এইডসকে জনস্বাস্থ্যের বিপদ হিসেবে শেষ করার অন্তর্জাতিক লক্ষ্যে অবদান রাখা। এর সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে দেশব্যাপী সচেতনতা প্রচার গতিশীল করার পদক্ষেপ নেয় সরকার। নাকো সমন্বিত মাল্টিমিডিয়া প্রচারের মাধ্যমে জাতীয় স্তরে সচেতনতা চালায়- যুবসমাজ-সহ বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে গণমাধ্যম, ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও, হোডিং, বাস প্যানেল, তথ্যকেন্দ্র, লোকসংস্কৃতি-নির্ভর অনুষ্ঠান ও আইইসি ভ্যানের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো হয়।
অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত দেশে ১৫৮৭-টি লক্ষ্য-ভিত্তিক প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যাতে প্রতিরোধ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও সেবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। সারা দেশে বৈষম্য কমাতে বিষয়-ভিত্তিক প্রচার চালানো হয় এবং কর্মক্ষেত্র, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমস্ত স্তরে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের অন্তর্ভুক্তি বাড়ে। ২০১৭ সালের আইন অনুযায়ী ৩৪-টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ওমবাডসম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের বিরুদ্ধে বৈষম্য সংক্রান্ত অভিযোগ শোনা এদের কাজ। এটি মানুষের মর্যাদা ও অধিকারের সুরক্ষায় সরকারের সহায়তা করে। এর মোকাবিলায় ভারত প্রথম থেকেই দৃঢ় পদক্ষেপ করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ের ভিত্তি স্থাপন থেকে শুরু করে এনএএসপি-V-এর ভবিষ্যৎমুখী লক্ষ্য, ভারত ধারাবাহিকভাবে দেখিয়েছে নেতৃত্ব, অধিকার-ভিত্তিক নীতি, সামাজিক প্রতিরোধ, এবং উন্নত যোগাযোগ উদ্যোগের গুরুত্ব। বর্ধিত পরীক্ষা, চিকিৎসার সহজলভ্যতার বিস্তার, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীসমূহের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সেবা, বৈষম্য প্রতিরোধ উদ্যোগ এবং রাজ্য ও সমাজের যৌথ অংশগ্রহণের ফলে ভারতে এইডস হ্রাসের হার অন্তর্জাতিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।
