অর্ণব দত্ত
১৯৫০ সালে অ্যালান ট্যুরিং নামে এক ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ওই গবেষণাপত্রে তিনি প্রস্তাব দেন, কোনও মেশিনের সাহায্য মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটানো সম্ভবপর কিনা। এআই কিংবা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শব্দটির প্রথম নামকরণ করেন কম্পিউটার বিজ্ঞানী জন ম্যাককার্থি। এরপর ১৯৫৬ সালে এআই একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
বর্তমানে গোটা বিশ্বব্যাপী এআইয়ের রমরমা। এদিকে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এআইয়ের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বহু মানুষ বর্তমানে মানসিক অসুস্থতার শিকার। বিশ্বের উন্নত দেশগুলির গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শিশুদের মানসিক বিকাশের পক্ষে বাধা হয়ে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ৭০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী লাগাতারভাবে এআই ব্যবহার করছে। বিশেষত হোমওয়ার্ক সহজে সারার জন্য। এব্যাপারে অভিভাবকদের সতর্ক হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। অন্তত শিশুদের ভবিষ্যতের স্বার্থে।
একই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে ভারতে। ভারতের বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার কর্তাদের মতে, চাকরিপ্রার্থীরা ই-মেল লেখা থেকে শুরু করে চাকরির আবেদনপত্র লেখার জন্যও এআই ব্যবহার করছে। এর ফলে স্বতন্ত্রভাবে বা স্বাধীনভাবে চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন ওঁরা। এদিকে ওঁদের অনেকেই স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বলে জানা গিয়েছে।
কর্পোরেট সংস্থাগুলির কর্তারা জানাচ্ছেন, এআই ব্যবহার করে যে চাকরিপ্রার্থীরা পরীক্ষার উত্তরপত্র লিখছেন, ইন্টারভিউ পর্বে ওঁরা ব্যাখ্যাই করতে পারছেন না যে নিজেরা কী লিখেছেন। একদিকে চাকরির আকাল, অন্যদিকে শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের মাঠে মেরে দেওয়ার যে ঝোঁক ভারতে দেখা দিয়েছে, তা উদ্বেগজনক। বিভিন্ন বাণিজ্য সংস্থার মতে, ভারতে একদিকে যুব সম্প্রদায় দাবি তুলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও ওঁদের চাকরি-বাকরি মিলছে না। এই দাবি আংশিক সত্য। এদিকে অনেকক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলিকে দক্ষ কর্মী পেতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। সংস্থাগুলি মনে করে কর্মীরা তাদের পরিবারের অংশ অন্তত চাকরিকালীন সময়ে। এদিকে যুব সম্প্রদায়ের কর্মীরা সংস্থার আশাপূরণ করতে পারছেন না। ওঁরা চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা হারিয়েছেন অনেকাংশে কৈশোর থেকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের লাগাতার ব্যবহারজনিত আসক্তির ফলে।
ভারতের বাণিজ্যক সংস্থার চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারদের একাংশের এই দাবিকে সমর্থন করেছেন বিশিষ্ট মার্কিন মনোবিজ্ঞানী গ্যারি মারকাস। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসিতে প্রখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমআইটির গবেষক নাতালিয়া কসমিনা একই দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, “চাকরি পাওয়ার জন্যে ইন্টার্ন হিসেবে যাঁরা আবেদন করছেন, ওঁদের আবেদনপত্রগুলি খতিয়ে একটি ব্যাপার স্পষ্ট। যে সমস্ত প্রার্থী বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থায় ইন্টার্ন হিসেবে আবেদন করেছেন ওঁদের আবেদনপত্রগুলি খতিয়ে দেখে জানা গিয়েছে, বেশিরভাগ আবেদনপত্রর বয়ান একই। কারণ ওঁরা সকলে আবেদনপত্র বানানোর সময় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করেছেন।“
সবমিলিয়ে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশ কিংবা বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে ছাত্রছাত্রী এবং যুব সমাজ এআই-এর করাল গ্রাসের শিকার। ফলে পৃথিবীতে ভবিষ্যতের জ্ঞানচর্চার আবহ বিপদের মুখে, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এককালে মুখস্থবিদ্যা ছিল সমাজে নিন্দনীয়। কেবল বই মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উপরে দিত যাঁরা, সেই রীতি বিদেয় হয়ে এআই নামক নতুন আরেকটি ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন দুনিয়া।
গোটা দুনিয়াব্যাপী শিক্ষাবিদরা লক্ষ্য করছেন, ছাত্রছাত্রীদের এআই ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে মূলত প্রশ্নাবলীর উত্তর দ্রুত লিখে ফেলে বাজি মাত করার প্রবণতার কারণে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে উত্তরদাতারা এলোমেলো কিংবা অপ্রাসঙ্গিক উত্তর লিখছেন। এও এআই ব্যবহারের দরুণ। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পরে টপাটপ উত্তর লিখে ফেলা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য নয়। বরং উত্তর লেখার আগে ভাবনাচিন্তা করা দরকার কী লেখা উচিত।
কোনও কোনও ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের আসক্তি যেন অনেকটা মাদকের নেশায় পরিণত হয়েছে। প্রখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমআইটির এক শিক্ষক জানিয়েছেন, তিনি তাঁর একজন ছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করেন, যে নিবন্ধটি ওকে লিখতে দেওয়া হয়েছিল, সেটি লেখার জন্যে কেন এআই ব্যবহার করেছে সে ? মাস্টারমশাইয়ের প্রশ্ন শুনে ওই ছাত্রী কান্নাকাটি করতে শুরু করে্ এবং বলে যে, এআই ঘৃণা করে সে। কিন্তু এআই আসক্তিতে অভ্যাসবশত কাজটি করে খুবই অনুতপ্ত সে।