ওঙ্কার ডেস্ক : আহমেদাবাদে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার কারণ পাইলটের ইচ্ছাকৃত ভুল। এমন বিতর্কিত মন্তব্য করে এয়ার ইন্ডিয়া বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে হুলুস্থুল ফেলে দিলেন ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিমান বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন মোহন রঙ্গনাথন। জ্বালানি কাটঅফ সুইচ এবং ককপিট অডিওর ধারাবাহিকতা দেখে তিনি এমনটাই মনে করছেন বলে একটি টিভি চ্যানেলে জানিয়েছেন। বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি মনে করছেন, এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১-এর মারাত্মক দুর্ঘটনাটি ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের তৈরি। যা দুর্ঘটনা নিশ্চিত ভাবে ডেকে এনেছে। এমন কি, আত্মহত্যারও সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।
বিমানে জ্বালানি বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে এনডিটিভি-র প্রশ্নের উত্তরে রঙ্গনাথন জানিয়েছেন, “এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে করা যাবে না কারণ জ্বালানির সুইচগুলি স্লাইডিং টাইপের নয়। এগুলি একটি স্লটে থাকার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, এবং আপনাকে এগুলিকে উপরে বা নীচে সরানোর জন্য টেনে বের করতে হবে। সুতরাং, অসাবধানতাবশত এগুলিকে ‘অফ’ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যায় না। তাই এটি অবশ্যই ইচ্ছাকৃতভাবে ‘অফ’ করে দেওয়ার ঘটনা”।
ভারতের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো (AAIB) ১২ জুনের দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টে প্রকাশ করার মাত্র ২৪ ঘন্টা পরে তার এই মন্তব্য শোরগোল তুলেছে। কারণ এই বিমান দুর্ঘটনায় বিমানের ২৪১ জন এবং ভেঙে পড়ার জায়গায় আরও ১৯ জন নিহত হয়েছিল। ২০১১ সালে বাণিজ্যিকভাবে বিমান পরিষেবা শুরু করার পর থেকে এটিই ছিল বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানের প্রথম মারাত্মক দুর্ঘটনা।
এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ১৭১, বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার, আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১২ জুন ঠিক ১৩:৩৯ মিনিটে লন্ডন গ্যাটউইকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। বিমানটিতে ২২৮ জন যাত্রী এবং ১৪ জন ক্রু ছিলেন। বত্রিশ সেকেন্ড পরে, বিমানটি উভয় ইঞ্জিনের জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, যার ফলে দ্রুত নেমে আসে এবং রানওয়ে থেকে মাত্র ১.২ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি মেডিকেল হোস্টেলে ধাক্কা খায়। বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ, বিমানের বর্ধিত এয়ারবর্ন ফ্লাইট রেকর্ডার (EAFR) থেকে ফ্লাইট ডেটা এবং CVR থেকে ককপিট ভয়েস রেকর্ডিং ফ্লাইট ১৭১-এর শেষ সেকেন্ডে বিমানটির যান্ত্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে এই গোলযোগ দেখা গেছে।
AAIB রিপোর্ট অনুসারে, ইঞ্জিন ১ এবং ২ নিয়ন্ত্রণকারী উভয় জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচ একে অপরের এক সেকেন্ডের মধ্যে “RUN” থেকে “CUTOFF” এ পরিণত হয়েছিল। ককপিটের সেন্টারের নিচে যে সুইচগুলি থাকে তা একটি গার্ড রেল দ্বারা সুরক্ষিত। এর পরিবর্তন করতে গেলে ম্যানুয়ালিই করতে হয়। এগুলি স্পর্শ-সংবেদনশীল নয় এবং টার্বুলেন্স, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা সফ্টওয়্যার ত্রুটির কারণে ট্রিগার করা যায় না।
রঙ্গনাথন জানিয়েছেন, “আমি শুনেছি ক্যাপ্টেনের কিছু চিকিৎসার অতীত ছিল। টেকঅফ পয়েন্টে ইঞ্জিন চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উভয় সুইচকে একের পর এক ‘অফ’ অবস্থানে সরানো হয়। এটি ম্যানুয়ালি করতে হয়। ককপিট ভয়েস রেকর্ডার অনুযায়ী একজন পাইলট জিজ্ঞাসা শোনা গেছে, ‘আপনি এটি কেন করলেন ?’ এবং অন্য পাইলট উত্তর দেন, ‘আমি এটি করিনি।’ এখানেই রিপোর্টে কিছু অসঙ্গতি দেখানো হয়েছে, প্রায় ধামাচাপা দেওয়ার মতো”। রঙ্গনাথন আরও বলেন, “টেকঅফ এবং ল্যান্ডিংয়ের সময় সব পাইলটের হেডফোন ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। ককপিট এরিয়া মাইক্রোফোনের উপর ভিত্তি করে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার স্পষ্টভাবে জানাবে যে অডিওটি CAM 1 (ক্যাপ্টেন) নাকি CAM 2 (সহ-পাইলট) থেকে এসেছে। তাই, ‘একজন পাইলট এটা বলেছেন এবং অন্য পাইলট এটা বলেছেন’ এমন অস্পষ্ট শব্দ রিপোর্টে ব্যবহার করা ঠিক নয়”।
রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ক্যাপ্টেন ছিলেন পাইলট পর্যবেক্ষণকারী, এবং সহ-পাইলট ছিলেন বিমান চালক। পাইলট যখন বিমানটি চালায় তখন তার উভয় হাত নিয়ন্ত্রণ কলামে থাকে, কারণ এটি স্বয়ংক্রিয় নয়। তাঁরা বিমানটি ঘোরানো এবং অটোপাইলট সেট করার উপর মনোযোগ দেন। এটা ম্যানুয়াল পদ্ধতি। ক্যাপ্টেন রঙ্গনাথন দাবি করেছেন, এয়ার ইন্ডিয়ার বেশ কয়েকজন পাইলট তাঁকে জানিয়েছেন যে বিমানের একজন ক্রু সদস্যের শারীরিক অবস্থার কথা জানা ছিল এবং দুর্ঘটনার আগে চিকিৎসার জন্য তিনি ছুটিতে ছিলেন। রঙ্গনাথন বলেছেন, “এয়ার ইন্ডিয়ার বেশ কয়েকজন পাইলট জানিয়েছেন যে ক্যাপ্টেনের শারীরিক অবস্থা খারাপ এবং তিনি কিছুদিন ধরে চিকিৎসা ছুটিতে ছিলেন। যদি কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে অবগত না থাকেন, তাহলে আমি অবাক হব কারণ অনেক লাইন পাইলটই এটি সম্পর্কে জানতেন”।
এএআইবি রিপোর্টে জানান হয়েছে, উভয় পাইলটই চিকিৎসাগতভাবে ফিট ছিলেন এবং তাদের বার্ষিক ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তবে ক্যাপ্টেন রঙ্গনাথন কেবল দুর্ঘটনার আগের দিনগুলিতে নয়, বরং পূর্ববর্তী মাসগুলিতে ক্রুদের মানসিক এবং আচরণগত স্বাস্থ্যের গভীর তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “গত কয়েক মাসের হিসাব করে দেখা উচিত যে পাইলট কি ধরণের চিকিৎসায় ছুটিতে ছিলেন এবং কেন ছিলেন। এই সমস্ত কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা উচিত”।
পাইলট-সৃষ্ট দুর্ঘটনা বিরল, কিন্তু নজিরবিহীন নয়। ক্যাপ্টেন রঙ্গনাথন ২০১৫ সালে জার্মানউইংস ফ্লাইট ৯৫২৫ দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে সহ-পাইলট ইচ্ছাকৃতভাবে বিমানটি ফরাসি আল্পসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, যার ফলে ১৫০ জন আরোহীর সকলেই মারা গিয়েছিলেন। এরকমই সন্দেহজনক ঘটনার মধ্যে রয়েছে ইজিপ্টএয়ার ফ্লাইট ৯৯০ (১৯৯৯), সিল্কএয়ার ফ্লাইট ১৮৫ (১৯৯৭), এবং চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৫৭৩৫ (২০২২)। মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ফ্লাইট MH370 এর ক্ষেত্রে, অনেক বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন যে পাইলট ইচ্ছাকৃতভাবে বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার আগে অন্য দিকে ঘুরিয়েছিলেন।
রঙ্গনাথন বলেন, “সিল্কএয়ারের দুর্ঘটনার সময় আমি সিঙ্গাপুরে ছিলাম, এবং আমি সেই ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলাম। ইন্দোনেশিয়ান কর্তৃপক্ষ এটিকে যান্ত্রিক ত্রুটি হিসেবে খাটো করে দেখার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু NTSB প্রমাণ করেছে যে এটি একজন পাইলটের আত্মহত্যা। তারপর মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট 370, জার্মানউইংস, ইজিপ্টএয়ারের ফ্লাইট 990 এবং কয়েক বছর আগে চীনের একটি। এই ঘটনাগুলি বিশ্বব্যাপী ঘটেছে। যখন কেউ চাপের মধ্যে থাকে অথবা চাপ এবং বিষণ্ণতার সংমিশ্রণে থাকে, তখন এটি এই ধরণের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে”। তাঁর অভিযোগ, অনেক ভারতীয় বিমান সংস্থা এমনকি বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তর (DGCA) বারবার সতর্ক করার পরেও পাইলটদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই বিষয়ে তিনি একটি মারাত্মক তথ্য দিয়েছেন, তা হল- ভারতের কোনও বিমান সংস্থা চিকিৎসা মূল্যায়নের সময় তাদের পাইলটদের মানসিক প্রোফাইল রাখে না। রঙ্গনাথন বলেন, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এই বিষয়ে সতর্ক করে আসছে, কিন্তু কেউই এটা কর্ণপাত করে না। মানুষ সংযোগ এবং সময়সূচীকে অগ্রাধিকার দেয়। পাইলটদের মানুষের চেয়ে মেশিনের মতো আচরণ করে। বিমান সংস্থা, নিয়ন্ত্রক বা ভারতের বিচার বিভাগ কেউই পুরোপুরি বোঝে না যে ক্লান্তি এবং চাপ কী করতে পারে, এবং এখন আমরা এর জন্য মূল্য দিচ্ছি”।
শনিবার বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী কিঞ্জারপু রাম মোহন নাইডুও বলেছেন গত মাসে আহমেদাবাদ-লন্ডন এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান দুর্ঘটনার বিষয়ে বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো (AAIB-র রিপোর্টের প্রাথমিক অনুসন্ধানের উপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়”। এই রিপোর্ট প্রকাশের কয়েক ঘন্টা পর, বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী কিঞ্জারপু রাম মোহন নাইডু চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর জন্য সওয়াল করেছেন। তাঁর কথায়, “আমি মনে করি না যে আমাদের এই বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্তে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। আমি বিশ্বাস করি আমাদের কাছে সমগ্র বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দুর্দান্ত পাইলট এবং ক্রু কর্মী রয়েছে। দেশের পাইলট এবং ক্রুদের সমস্ত প্রচেষ্টার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। তাঁরা অসামরিক বিমান চলাচলের মেরুদণ্ড, বিমান চলাচলের প্রাথমিক সম্পদ। আমরা পাইলটদের কল্যাণ এবং সুস্থতার জন্যও যত্নশীল। তাই আসুন আমরা এই পর্যায়ে কোনও সিদ্ধান্তে ঝাঁপিয়ে না পড়ি এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করি”।
