ওঙ্কার ডেস্ক: ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট সংসদের রাজ্যসভায় দাঁড়িয়ে অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপ করে অনুচ্ছেদ ৩৭০ তুলে দেওয়ার কথা। আর ঠিক ছয় বছর পরে, এই একই দিনে আরও একটি ইতিহাস গড়লেন তিনি দেশের সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে। অমিত শাহের মেয়াদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের দিনসংখ্যা পৌঁছেছে ২,১৯৪-এ। এই রেকর্ড এতদিন পর্যন্ত ছিল লালকৃষ্ণ আডবাণীর দখলে ২,১৯৩ দিন। তার আগে ছিলেন গোবিন্দ বল্লভ পন্থ, যিনি ৬ বছর ৫৬ দিন ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন। অমিত শাহ ছাড়িয়ে গেলেন সকলকে, ৬ বছর ৬৫ দিন পূর্ণ করে।
২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় অমিত শাহ যাঁর হাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দায়িত্ব তুলে দেন, তিনি কার্যত দায়িত্ব নেওয়ার পরই রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড় বদলের পথে হেঁটেছিলেন। অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপ ছিল শুধুই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, ছিল বিজেপির দীর্ঘদিনের আদর্শগত লড়াইয়ের বাস্তবায়ন। জম্মু-কাশ্মীরের পুনর্গঠন আইন এনে রাজ্যটিকে ভাগ করে দেওয়া হয় দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ। শাহ রাজ্যসভায় যেই প্রস্তাব পেশ করেন, তা রাষ্ট্রপতির আদেশ দ্বারা পরিচালিত ছিল এবং ১৯৫৪ সালের পুরনো আদেশকে বাতিল করে জম্মু-কাশ্মীরের ওপর ভারতীয় সংবিধানের সব ধারা কার্যকর করে।
শাহের মেয়াদে কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা অনেকটাই কমেছে বলে দাবি করেছে শাষক দল। কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, সন্ত্রাসে মৃত্যুর হার কমেছে ৭০ শতাংশ এবং নিরাপত্তারক্ষীর প্রাণহানি কমেছে ৫৬ শতাংশ। এই সময়ের মধ্যে কাশ্মীর পর্যটনেও নতুন জোয়ার এসেছে, যা পাকিস্তানের দিক থেকেও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে তাঁর নেতৃত্বে দেশের ভিতরে সক্রিয় চরমপন্থী আন্দোলনের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। বিশেষ করে নকশাল প্রভাবিত এলাকাগুলিতে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে যেখানে প্রায় ৫,২০০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, সেখানে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬০০-র নিচে। একাধিক রাজ্যে সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়ে চরমপন্থা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি কেন্দ্রের।
শাহের নেতৃত্বে পাশ হয়েছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), যা পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে আগত সংখ্যালঘু হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব পেতে সুবিধা দেওয়ার কথা বলে। এই আইন নিয়ে দেশে বড়সড় আন্দোলন এবং বিতর্ক দেখা গেলেও বিজেপি নেতৃত্ব তা ইতিহাস পরিবর্তকারী নীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। পাশাপাশি, শাহের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল দেশের ফৌজদারি আইনে সংস্কার আনা। ভারতীয় দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রমাণ আইন বদলে আনা হয়েছে ভারতীয় ন্যায় সঞ্জীবিনী, নাগরিক সুরক্ষা সঞ্জীবিনী এবং ভারতীয় সাক্ষ্য আইন। এই তিনটি নতুন আইনকে অনেকেই স্বাধীন ভারতের নিজস্ব বিচার কাঠামোর পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখছেন।
তাঁর মেয়াদে বিলুপ্ত হয় তিন তালাক প্রথা, যা মুসলিম মহিলাদের জন্য বড় সামাজিক সুরক্ষা হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। এছাড়াও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে একাধিকবার জোরালো সওয়াল করতে দেখা গেছে অমিত শাহকে। তাঁর মতে, ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা আইন গণতান্ত্রিক দেশে যুক্তিযুক্ত নয়, এক দেশ, এক আইনের পক্ষেই দাঁড়াতে হবে। তবে অমিত শাহের ছয় বছরের এই মেয়াদ কেবল সাফল্যের রেখাচিত্রে আঁকা নয়। দেশের উত্তর-পূর্বে মণিপুরে চলতে থাকা দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত হিংসা এই সরকারের ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গিয়েছে। ২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, বহু মানুষ গৃহহীন হয়েছেন, বহু বসতি পুড়েছে। এখনও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
