অর্ণব দত্ত
নয়াদিল্লি এইমসের ডাক্তারবাবুরা ভারতীয় নাগরিক কিশোরীদের বিশেষ ধরনের একটি গুরুতর শারীরিক সমস্যা চিহ্নিত করেছেন। এনিয়ে রাজধানীর বেশ কয়েকটি সরকারি স্কুল এবং বেসরকারি স্কুলে সমীক্ষা চালিয়ে যে রোগটি চিহ্নিত করা হয়েছে, তার নাম পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম। সংক্ষেপে যা পিসিওএস হিসেবে পরিচিত। অন্তত চার হাজার কিশোরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরে এইমসের ডাক্তাররা এই সমস্যার কিছু উপসর্গ সম্পর্কে জানিয়েছেন। যেমন, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম নামে ডিম্বাশয়ের জটিল এই সমস্যায় আক্রান্ত কিশোরীদের অনিয়মিত ঋতুস্রাব থেকে শুরু করে ওরা টাইপ টু ডায়াবেটিস কিংবা হরমোনজনিত এবং পরিপাকজনিত হরেক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। যার ফলে কিশোরীদের একাংশের জীবনযাপন পদ্ধতিতে অস্বাভাবিকতা দেখা দিচ্ছে। দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের মানসিক সমস্যাও।
দিল্লি এইমস যে সমীক্ষা চালিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে অন্তত ৫ শতাংশ স্কুলছাত্রী ডিম্বাশয়জনিত জটিলতা তথা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে আক্রান্ত। অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থা সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুসারে, সারা বিশ্বে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ মহিলা এই রোগে আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত। এদিকে সারা বিশ্বে ৭০ শতাংশ মহিলা এই রোগে আক্রান্ত হলেও ওরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। অন্যতম কারণ উদাসীনতা তথা অজ্ঞতা। যদিও এই রোগের চিকিৎসার গাইডলাইন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ণয় করেছে।
নয়াদিল্লির এইমসের ডাক্তারবাবুরা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম নিয়ে সম্প্রতি রাজধানীতে সাংবাদিক বৈঠক করলেন। সূত্রের খবর, এইমসে কর্মরত চিকিৎসকের একটি দল বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। স্কুল ছাত্রীদের উপর এই গবেষণা শুরু হয় ২০২৩ সালে। সম্প্রতি গবেষণার কাজ শেষ হওয়ার পরে এসম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেল।
গবেষকরা জানিয়েছেন, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে আক্রান্ত কিশোরীরা প্রাপ্তবয়স্কা হলে তাঁদের বৈবাহিক জীবনে প্রজননঘটিত জটিল সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এক্ষেত্রে হরমোনঘটিত অসামঞ্জস্য দেখা দিতে পারে। সাংবাদিক বৈঠকে নয়াদিল্লির এইমস হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক এনডোক্রিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক রজনী শর্মা বলেছেন, “পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে আক্রান্ত কিশোরীদের বয়স সমীক্ষা অনুসারে ১০ বছর থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। ওরা কেবল ডিম্বাশয়ঘটিত সমস্যায় আক্রান্ত নয়, পরিপাকজনিত সমস্যা থেকে আরম্ভ করে নানা ধরনে্র মানসিক-শারীরিক সমস্যার শিকার। এর মধ্যে রয়েছে ঋতুকালীন অস্বাভাবিকতাও।“
অন্যদিকে, এব্যাপারে এইমসের গবেষক চিকিৎসক অধ্যাপক বন্দনা জৈন জানিয়েছেন, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে আক্রান্তদের জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন সমস্যা মোকাবিলায় কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বাইরের খাবার না খেয়ে ঘরে রান্নাবান্না করা খাবার খেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। পর্যাপ্ত পরিমানে ফলমূল, শাকসবজি, প্রোটিনজাতীয় খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিদিন ব্যায়ামও করা উচিত।
এইমসের অ্যানাটমি বিভাগের অধ্যাপক রিমা ডাডার পরামর্শ, “নিয়মিত যোগচর্চা করলেও পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমজনিত সমস্যার মোকাবিলা করা যেতে পারে মানসিক উদ্বেগকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অনিদ্রাজনিত সমস্যা কাটিয়ে। এভাবে বৃদ্ধি করা যেতে পারে আত্মবিশ্বাস।“
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম সূত্রের খবর, এই অসুখে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ইতালি। অন্যদিকে, বিশ্বের প্রতি আটজন মহিলার মধ্যে একজন এই রোগের শিকার বলে জানা গিয়েছে। যা আনুপাতিক হারে ৮ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা জার্নালগুলি অনুসারে, সারা বিশ্বে ১৭ কোটি নাবালিকা এবং প্রাপ্তবয়স্কা মহিলা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে আক্রান্ত হলেও ৭০ শতাংশই সচেতন নন রোগ সম্পর্কে। আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই তরুণী কিংবা নাবালিকা।
ডাক্তারবাবুরা কয়েকটি উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন করে জানিয়েছেন, কেন এই রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোন কোন উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি। কয়েকটি কারণের মধ্যে রয়েছে অনিয়মিত ঋতুকালীন অবস্থা, দেহের ওজন মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়া, মনমেজাজের অস্বাভাবিক পরিবরর্তন ইত্যাদি।
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম কীভাবে তথা সুনির্দিষ্ট উপায়ে সারানো যেতে পারে, এসম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনও দিশা নেই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছেও। বিষয়টি নিয়ে ভারতের পাশাপাশি বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে গবেষণারত চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। অপ্রাসঙ্গিক হবে না ওই পোস্টটি উল্লেখ করলে। হাস্যকর মনে হলেও ভিনদেশি একজন চিকিৎসক ওই পোস্টে লিখেছেন, “চিকিৎসা শাস্ত্রের বিপুল অগ্রগতির অন্যতম কারণ বিশ্বব্যাপী রোগব্যাধি হু-হু করে বেড়ে চলেছে।”