নিজস্ব সংবাদদাতা, ইটানগর : কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫০-২০০ জন বিক্ষোভকারী—যাদের অনেকের হাতেই দা, লাঠি ও গুলতি ছিল—পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করার ও ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। এরপর তারা নিরাপত্তা কর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে শুরু করে।
অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত ১১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’-এর বিরুদ্ধে চলতি বিক্ষোভ আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল। বিক্ষুব্ধরা আগুন ধরালো পূর্ব সিয়াং জেলায় একটি এনএইচপিসি অফিস ও স্থানীয় থানায়। এছাড়া, রাজ্যের বিজেপি সভাপতি সহ দুই রাজনৈতিক নেতার বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। শনিবার এই খবর দিয়েছেন রাজ্যের এক উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক। তিনি জানিয়েছেন, পাসিঘাটে বিক্ষোভকারীদের ছোড়া পাথরের আঘাতে বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মীও আহত হয়েছেন।
পাসিঘাটের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ টনি তাতা জানিয়েছেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতিবাদে ডাকা ১২ ঘণ্টার বনধ শেষ হওয়ার পর, শুক্রবার রাত ১১টা নাগাদ এই হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে। তিনি আরও জানিয়েছেন, “বিক্ষোভকারীরা বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি ও প্রাক্তন বিধায়ক কালিং ময়ং এবং পাসিঘাট পশ্চিমের বিধায়ক নিনং এরিং-এর বাসভবনে ভাঙচুর চালিয়েছে। আদি সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ সংগঠন ‘আদি বানে কেবাং’-এর অফিসেও ভাঙচুর চালানো হয়েছে”। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন ডিএসপি টনি তাতাও। তিনি বলেছেন বলেছেন, “প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতিবাদে সিয়াং, আপার সিয়াং এবং পূর্ব সিয়াং জেলায় ডাকা বনধ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই এই হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা মেবো এলাকা থেকে এসেছিল। এই ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ১২ ঘণ্টার বনধ চলাকালীন সিয়াং জেলায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী তখন কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, প্রায় ১৫০-২০০ জন বিক্ষোভকারী দা, লাঠি ও গুলতি নিয়ে চড়াও হয়। চেষ্টা করে। এরপর তারা নিরাপত্তা কর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে।
পূর্ব সিয়াং জেলার মেবোতে রানাঘাট সেতুর কাছেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা পুলিশ কর্মীদের ওপর পাথর ছুড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি এই হিংসার তীব্র নিন্দা করেছে। পাশাপাশি, ধর্মঘটের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহারের ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে তারা।
‘আদি বানে কেবাং ইউনাইটেড’, ‘এসইউএমপি এফেক্টেড এরিয়া ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন’, ‘সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরাম ইয়ুথ উইং’ এবং ‘আদি গালো ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’—এই সংগঠনগুলো যৌথভাবে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল।
তাদের দাবি, গ্রেপ্তার হওয়া ১০ জন আন্দোলনকারীকে মুক্তি দেওয়া, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ‘গাঁও বুড়া’দের পুনর্বহাল করা, প্রকল্পটির সঙ্গে সম্পর্কিত সব কার্যক্রম প্রত্যাহার করা এবং ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা আধা-সামরিক ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়া।
অরুণাচল প্রদেশ সরকার প্রস্তাবিত ১১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া যাচাইহীন গুজব, বিভ্রান্তিকর দাবি ও ভুয়া খবরের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া, প্রস্তাবিত এই প্রকল্প সম্পর্কে সঠিক তথ্য পেতে সরকারি বিজ্ঞপ্তি, প্রেস বিজ্ঞপ্তি এবং অনুমোদিত মাধ্যমগুলোর ওপর নির্ভর করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে, শিয়াং নদী অববাহিকা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর ১১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্পটি সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বিরোধিতার মুখে পড়েছে। রাজ্য সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হল শিয়াং অববাহিকায় জল সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা—বিশেষ করে এই নদীতে চিনের প্রস্তাবিত বিশাল বাঁধ নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার আরও জানিয়েছে, এই প্রকল্পের লক্ষ্য হল জাতীয় জল ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করা।
সরকার স্পষ্ট ভাবে জানিয়েছে, বর্তমানে যে কাজ চলছে তা শুধুমাত্র প্রকল্পের সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য। সেকারণে প্রয়োজনীয় ‘প্রি-ফিজিবিলিটি রিপোর্ট’ তৈরির লক্ষ্যে পরিচালিত কারিগরি ও পরিবেশগত জরিপের প্রক্রিয়া চলছে। স্থানীয় স্বার্থ রক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং প্রকল্প-ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কল্যাণ, অধিকার, ভূমির নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।