মৌসুমী পাল, কলকাতা : বঙ্গ বিজেপিতে নেতৃত্ব বদলের জল্পনা এক প্রকার শেষ। সুকান্ত মজুমদারের অধ্যায় শেষ হতে চলেছে, আর রাজ্য সভাপতি হিসেবে শমীক ভট্টাচার্যের নাম কার্যত চূড়ান্ত। ঠিক নির্বাচনমুখী সময়ে, যখন পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট আর মাত্র আট মাস দূরে, তখন বিজেপির এই সিদ্ধান্ত কি যুক্তিসঙ্গত, নাকি বিপজ্জনক ? শমীক ভট্টাচার্য বিজেপির ‘আদি’ নেতা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাজ্যের গেরুয়া শিবিরের মুখপাত্রের দায়িত্ব সামলেছেন, রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবেও সক্রিয়। শিক্ষিত, মার্জিত ভাষা, মিডিয়া–ফ্রেন্ডলি ভাবমূর্তি—সবই আছে। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। দলের ভিতরে–বাইরে গুঞ্জন রয়েছে, শমীক ব্যক্তিগত জীবনে ‘নারীসঙ্গ’ বিতর্কে জড়িত, যেটা অবশ্য রাজনৈতিক শিবিরে গোপন কথা নয়। রাজ্যে যেখানে বিজেপির ভোটের মেরুকরণ এখনও মূলত নেতিবাচক আর মজবুত তৃণমূল নেতৃত্ব বিরোধিতা নির্ভর করে, সেখানে বিধানসভা নির্বাচনের আর ৮ মাস বাকি সে অবস্থায় একজন বিতর্কিত নেতাকে সভাপতি হিসেবে তুলে আনা কি বিজেপির রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় ?
গত কয়েক মাস ধরেই বঙ্গ বিজেপিতে সাংগঠনিক দুর্বলতা, নির্বাচনে ধারাবাহিক ব্যর্থতা, বুথস্তরে মজবুত কাঠামো গড়ে তুলতে না পারা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। একের পর এক বৈঠকে জেপি নড্ডা, অমিত শাহ, সুনীল বনসলরা বারবার রাজ্য নেতাদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ২০২৬-এ বিধানসভা ভোটে লড়াই করতে হলে সংগঠন শক্ত করতে হবে। সেই লক্ষ্যেই নেতৃত্বে বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত। মঙ্গলবার রাজ্য বিজেপির রিটার্নিং অফিসার তথা বিধায়ক দীপক বর্মন বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন ২ জুলাই মনোনয়ন, ৩ জুলাই ভোট ও ফলপ্রকাশ। তবে বিজেপি সূত্রের খবর, আসলে কোনও ভোটই হচ্ছে না ! দলের একাংশের দাবি, শীর্ষ নেতৃত্ব চাইছে সর্বসম্মতভাবে শমীককেই রাজ্য সভাপতি করা হোক। তাই মনোনয়নে শমীকই একমাত্র প্রার্থী। ফলে ভোটের আর প্রয়োজন পড়বে না, বুধবারই সব আনুষ্ঠানিক হয়ে যাবে বলে দাবি করেছেন রাজ্য বিজেপির একাংশ।
গত রবিবার রাতেই দিল্লিতে বিজেপি সভাপতি জেপি নড্ডার বাড়িতে শমীকের দীর্ঘ বৈঠক হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে যদিও শমীক দাবি করেছিলেন, তিনি ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে বিদেশ সফরের রিপোর্ট দিতে গিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে সেই বৈঠকেই ভবিষ্যৎ সভাপতি হিসেবে তাঁকে বার্তা দেওয়া হয় বলে দলীয় সূত্রের দাবি। দিল্লির একাধিক সূত্রের দাবি, মঙ্গলবার দুপুর ১২ টা ৩৫ মিনিট নাগাদ শমীকের কাছে ফোন যায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে। বলা হয়, কলকাতায় ফিরে মনোনয়ন জমা দিতে। সেই মতোই বুধবার সকালে কলকাতায় ফিরেছেন তিনি। বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনসলও তাঁর সঙ্গে এসেছেন।
বঙ্গ বিজেপিতে শীর্ষ নেতৃত্বের রদবদলে প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষের নাম কার্যত বাতিল হয়ে গিয়েছে। অন্যসময় দিলীপের ‘লড়াকু’ ভাবমূর্তি কাজে লাগাতে চাইলেও এখন সংঘ থেকে দিল্লি, কেউই দিলীপকে নিয়ে তেমন ভাবছেন না বলেই খবর। সেই জায়গা দখল করেছেন তুলনামূলক ‘সমঝদার’ শমীক। দলের একাংশ মনে করছে, শমীকের মতো অভিজ্ঞ নেতা সভাপতির দায়িত্ব নিলে বুথে বুথে সংগঠন চাঙ্গা করতে সুবিধা হবে। অন্যদিকে, কিছু নেতা মনে করছেন, শমীক মৃদু প্রকৃতির মানুষ, তৃণমূলের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে দল কতটা আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে।
সব ঠিক থাকলে আজই বিজেপির সল্টলেক দফতরে শমীক মনোনয়ন জমা দেবেন। দ্বিতীয় আর কোনও নাম না এলে তাঁর নামই চূড়ান্ত হবে। আর এই ঘোষণার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে সুকান্ত অধ্যায়ের ইতি, শমীক যুগের সূচনা হবে বঙ্গ বিজেপিতে। এখন দেখার, ২০২৬-এর ভোটের আগে নতুন সভাপতির হাত ধরে বিজেপি সংগঠন কতটা মজবুত করতে পারে তৃণমূলের বিরুদ্ধে কতটা কঠিন লড়াই নামতে পারবে সেটাই বঙ্গ রাজনীতির বড় প্রশ্ন। সদ্য সমাপ্ত লোকসভা ভোটে রাজ্যের ফলই বিজেপিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে সংগঠন দুর্বল, বুথে প্রার্থীর অভাব, কর্মীরা হতাশ। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে নমনীয় নয়, দরকার শক্ত হাতে রাশ টানতে পারা লড়াকু নেতা। শমীক সেই জায়গায় কতটা ফিট, তা নিয়ে অনেকে সন্দিহান।
২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে বিজেপি বাংলায় শাসকদলের বিকল্প হতে পারবে কি না, তার অনেকটাই নির্ভর করছে নতুন সভাপতির কাঁধের উপর। শমীক যদি বিতর্ক সামলাতে না পারেন, যদি সংগঠন মজবুত করতে ব্যর্থ হন, তবে এই পদক্ষেপ বিজেপির জন্য ফল আশাপ্রদ না হতেও পারে। সংগঠন আর ভাবমূর্তি—দুটোই ভোটের আগে সমান গুরুত্বপূর্ণ। শমীক ভট্টাচার্য যদি বিতর্কের বাইরে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে না পারেন, তাহলে বঙ্গ বিজেপি তৃণমূলের কাছে ফের তাসের ঘর হয়েই থাকবে।
