ধর্মকীর্তির বুদ্ধমূর্তি
অসীম সেন
পর্ব-৩
দোতলায় ত্রিপাঠীজির শোবার ঘরেই দেরাজ। দেরাজ না বলে সিন্দুক বলাই ভালো। গোটা ঘরটাকে একবার জরিপ করে নিলেন প্রফেসর বাগচি। দরজা দিয়ে ঢুকে ডান দিকে রয়েছে দেরাজটা। পুরানো বাড়ি দেওয়াল গুলি বেশ মোটা। দেরাজের ওপর রুপোর লক্ষ্মী গণেশের মূর্তি। প্রতিদিন পুজো হয়। দরজার পাশে একটা ব্রোঞ্জের রোমান সৈনিকের মূর্তি। ঘরের পূর্ব দিকে একটা আলমারি। সেটার বয়সও নেহাত কম হবে না। দক্ষিণে একটা বিরাট জানালা। স্লাইডিং পাল্লাটা নতুন। এরমধ্যেই বসানো হয়েছে। জানলার ওপাশে সাজানো বাগান। ত্রিপাঠী শখ আছে বলতে হবে। থরে থরে মরশুমি ফুলের টব। দু মানুষ উঁচু পাঁচিলের ধার ঘেসে সার বেধে দেবদারু। জানলার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ হাত ঝাড়েন প্রফেসর বাগচি।
প্রফেসর বাগচিঃ দেখেছ কাণ্ড এখানে রীতিমত পিঁপড়ে বাসা বেধেছে।
ত্রিপাঠীঃ পিঁপড়ে ? পিঁপড়ে এখানে এল কী করে ?
সমিতাঃ দেরাজটা তালা দেওয়া ছিল না ?
ত্রিপাঠীঃ কী বলছেন ম্যাডাম? দেরাজে অত দামী একটা মূর্তি তাছাড়া ওটার মধ্যে যে গয়না বা টাকা রয়েছে তাও নেহাত কম নয়।
অসীমঃ চোর এল টাকা পয়সা না নিয়ে শুধু মূর্তিটা নিল। রীতিমত নির্লোভ চোর বলতে হবে।
সমিতাঃ এত ভারী দেরাজ, তালা ভাঙল কেউ আওয়াজ পেল না।
প্রফেসর বাগচিঃ মাষ্টার কি ইউজ করেছে বোধহয়।
ত্রিপাঠীঃ মাষ্টার কি দিয়েও ওই তালা খোলা সহজ নয় মিষ্টার বাগচি।
অসীমঃ তাছাড়া আপনি যে মূর্তিটা ঘরে এনে রেখেছেন সেটাও তো বাইরের লোকের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
সমিতাঃ এমনিতে আপনার বাড়িতে কে কে আছেন ?
ত্রিপাঠীঃ আমি একাই থাকি। স্ত্রী গত হয়েছেন পাঁচ বছর হল। ছেলে দুর্গাপুরে পাকাপাকি ভাবে থাকে। ওখানেই ব্যবসা করে। মাঝে মধ্যে আসে। আর বাড়িতে থাকে বলতে সুদর্শন…
প্রফেসর বাগচিঃ সুদর্শন কে ?
ত্রিপাঠীঃ সুদর্শন আমার ছোট বেলার বন্ধু। প্রাইমারি স্কুলে মাষ্টারি করত। রিটায়ারমেন্টের পর আমার সঙ্গে থাকে। পার্সনাল অ্যাসিস্টেন্ট বলতে পারেন। কালনায় বাড়ি। সপ্তাহে একবার বাড়ি যায়।
সমিতাঃ কতদিন ধরে তিনি আপনার এখানে আছেন ?
ত্রিপাঠীঃ তা আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমি ভীষণ একা হয়ে গেলাম। তখন আমিই ওকে আমার এখানে কাজের কথা বললাম। কেন ? আপনারা কি ওকে সন্দেহ করছেন?
প্রফেসর বাগচিঃ এখানে যতজন ক্যারেক্টার রয়েছেন সকলেই সাসপেক্ট। সুদর্শন বাবু ছাড়া আর কে কে থাকেন?
ত্রিপাঠীঃ গোটা কয়েক চাকরবাকর, রান্নার লোক রয়েছে। আমার ঠিক জানা নেই। ওই ব্যপারটা সুদর্শনই দেখে।
সমিতাঃ তা আপনার ছেলে লাস্ট কবে এসেছিলেন ?
গোয়েঙ্কাঃ ও তো এখন এখানেই আছে।
প্রফেসর বাগচিঃ সবার সঙ্গে একবার কথা বলা যাবে কি ?
ত্রিপাঠীঃ অবশ্যই আমি সুদর্শনকে বলে দিচ্ছি।
দোতলার হল ঘরে সবাইকে একে একে ডেকে কথা বলে নিলেন প্রফেসর বাগচি, সমিতা বাগচি আর অসীম সেন। চাকর বাকরগুলিকে সেভাবে সন্দেহের আওতায় আনা যায় না। কারণ সিসিটিভি বলছে তারা কেউই সেদিন দোতলায় ওঠেনি। ত্রিপাঠী সাহেবের ছেলে নীরজ। বয়স চল্লিশ। পেটাই চেহারা হঠাৎ করে দেখলে স্পোর্টম্যান মনে হতে পারে।
সমিতা বাগচিঃ আপনি কবে এসেছেন ?
নীরজঃ শুক্রবার।
প্রফেসর বাগচিঃ থাকছেন তো কিছুদিন ?
নীরজঃ বুদ্ধ মূর্তিটি সরকারের হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্ত থাকার কথা ছিল।
প্রফেসর বাগচিঃ এই যে এত দামী মূর্তি। আপনাদের হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, আপনার মত ছিল ?
নীরজঃ দেখুন মিষ্টার বাগচি। এটা সম্পূর্ণ আমাদের পরিবারের বিষয়। আপনাকে জানাব কেন বুঝতে পারছি না।
প্রফেসর বাগচিঃ কিন্তু এটাকি এখন আর আপনাদের পরিবারের বিষয় রয়েছে?
নীরজঃ আপনি কি পুলিশ ? এখানে আপনার ভূমিকা কী ?
অসীমঃ ওনারা দুজন পুলিশের অনুরোধে এখানে এসেছেন।
নীরজঃ টিকটিকি
প্রফেসর বাগচিঃ ঠিক টিকটিকি নয়। তবে অনেকে কুমীর ভাবে।
নীরজঃ মূর্তিটার জন্য সরকারের থেকে সামান্য কিছু সুবিধা পেয়েছি বটে। কিন্তু তা আর্থিক নয়। সুতরাং মূর্তি নিয়ে সরকারের প্রতি আমাদের কোনও দায়বদ্ধতা থাকতে পারে কি? আর তা ছাড়া বিষয়টা পুরোটাই পাপা দেখছেন। আমার ভালো লাগা বা মন্দ লাগা এখানে অর্থহীন। যাইহোক আমার একটা কাজ আছে। আমি কি এখন যেতে পারি।
অসীমঃ ও হ্যা নিশ্চই।
নীরজ বেরিয়ে যায়
অসীমঃ বড়লোকের বেয়াদপ সন্তান। জামাইবাবু এবার সুদর্শন বাবুকে ডাকা যাক।
প্রফেসর বাগচিঃ ডাকো। তবে তার আগে একটু খেয়ে এলে হত না। এরা তো চা ছাড়া আর কিছু ঠেকালো না।
সমিতাঃ তুমি থামবে ? এই তো আসার সময় লুচি খেয়ে এলে।
প্রফেসর বাগচিঃ খেলাম ? বয়স হচ্ছে তো সব কথা মনে থাকে না।
ইতিমধ্যে ঘরে ঢুকলেন সুদর্শন গোলদার।
সুদর্শনঃ আমাকে ডেকেছিলেন স্যার ?
অসীমঃ আপনার সঙ্গে দুটো কথা বলব। সময় আছে তো ?
সুদর্শনঃ রিটায়ার মানুষ। বন্ধুর ডাকে পড়ে আছি। হাতে সময়ের অভাব নেই।
সমিতাঃ আপনি কখন জানলেন যে মূর্তিটি চুরি গেছে ?
সুদর্শনঃ রবিবার ত্রিপাঠীজি মরনিং ওয়াক থেকে ফিরে ঘরে গিয়ে দেখেন মূর্তিটি নেই। তারপরেই আমায় জানান।
সমিতাঃ উনি কি বাইরে গেলে দরজা বন্ধ করে যেতেন না ?
সুদর্শনঃ সেরকম তো কোনওদিন দেখিনি। তবে দেরাজটা খুবই পোক্ত। আর দেরাজের তালাটা ভাঙা প্রায় অসম্ভব।
প্রফেসর বাগচিঃ বাড়ির চাকরবাকর কাউকে সন্দেহ হয় ?
সুদর্শনঃ সেভাবে তো কাউকে সন্দেহ হয় না। তাছাড়া ত্রিপাঠীজির ঘরের বাইরে সিসিটিভি রাখা আছে শনিবার আর রবিবারের ফুটেজে কাউকে ওই ঘরে ঢুকতে দেখা যায়নি। শনিবার রাতে দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে খাবার ওনার ঘরে দিয়ে আসা হয়েছিল। সে সময় আমিও ছিলাম ওনার সঙ্গে।
প্রফেসর বাগচিঃ ওনার ছেলের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক।
সুদর্শনঃ দেখুন এটা ওনাদের পরিবারে বিষয়। আমার সেভাবে জানা নেই। তবে ইদানিং বোধহয় নীরজের ব্যবসা ভালো চলছে না।
সমিতাঃ আপনি কী ভাবে জানলেন
সুদর্শনঃ টাকা নিয়ে বাপ ব্যাটায় কথা হচ্ছিল। তাছাড়া মূর্তিটা হাতছাড়া হোক এটাও চায়না নীরজ।
প্রফেসরঃ বাইরে থেকে কেউ আসেনি। ঘরের ভিতর শনিবার রাত আর রবিবার সকাল মিলিয়ে গিয়েছিলেন আপনি আর নীরজ। আপনাদের দুজনের মোটিভই কিন্তু স্ট্রং। কোনও কিছু লোকাবেন না সুদর্শন বাবু।
সুদর্শনঃ আমার বিষয়টা আপনারা দেখে নেবেন। তবে বলা উচিৎ হবে কিনা জানি না। শনিবার রাতে ত্রিপাঠীজির সঙ্গে ওনার ছেলের তুমুল অশান্তি হয়েছে এই মূর্তিটি নিয়ে।
অসীমঃ মানে ?
(চলবে)