ধর্মকীর্তির বুদ্ধমূর্তি
অসীম সেন
পর্ব-৫
হন্তদন্ত হয়ে বাইরে থেকে ঘরে ঢোকেন প্রফেসর বাগচি
প্রফেসর বাগচিঃ বাড়িটা একটু ঘুরে দেখছিলাম। আর দেরি করছ কেন অসীম ? বডিটা পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠাও। কী দিয়ে মারা হয়েছে খোঁজ পেলে ?
অসীমঃ তা এখনও পাইনি।
প্রফেসর বাগচিঃ তা পেলে আর তোমাদের অপদার্থ বলব কেন ? নীরজ বাবু কোথায় ?
অসীমঃ ওনার ঘরে।
প্রফেসর বাগচিঃ চলো একবার ওনার ঘরে যাওয়া যাক।
নিজের ঘরে পায়চারি করছেন নীরজ । প্রফেসার বাগচিকে দেখে কিছুটা চমকে গেলেন।
নীরজঃ আমার ঘরে আমাকে না জিজ্ঞাসা করে কেউ আসেন না।
প্রফেসর বাগচিঃ এখন তো আর ফরম্যালিটি করার সময় নেই নীরজ বাবু।
নীরজঃ আপনাকে কতবার বলেছি। মূর্তি নিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই। বারবার কেন আমায় ডিস্টার্ব করছেন ?
প্রফেসর বাগচিঃ (কড়া ভাবে) এত উত্তেজিত হবেন না মিষ্টার নীরজ ত্রিপাঠী। এটা আর এখন চুরির কেস নেই। একটা মার্ডার হয়ে গিয়েছে। খুন। মানেটা বুঝতে পারছেন নীরজ বাবু? আপনি বা আপনার ব্যবসায়ী বন্ধু যে কেউ এই বিষয়টার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।
নীরজঃ কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে ?
প্রফেসর বাগচিঃ প্রমাণ যথাসময়েই পেয়ে যাবেন।
নীরজঃ মিষ্টার বাগচি আমি মানছি আমার বন্ধু মূর্তিটি কিনতে চেয়েছিল। আমি মানছি আমার ব্যবসা ডুবে গেছে। এ সময়ে টাকাটা পেলে আমার সব সমস্যা মিটে যাবে। কিন্তু বাবা মূর্তিটি বিক্রি করতে চাননি। আমার বন্ধু এরপরেও কয়েকবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। সুদর্শন বাবুকেও টোপ দিয়েছিলাম। দেরাজের চাবিও জোগাড় করে আমার বন্ধুর হাতে তুলে দিয়েছি। তারপর আমি কিছু জানি না। আমি মূর্তি চুরি করিনি।
প্রফেসর বাগচিঃ আপনার বন্ধুর ঠিকানাটা দিন। এতক্ষণে পাখি বোধহয় মাল সহ ফুরুৎ হয়ে গিয়েছে।
দরজা দিয়ে বাইরে বেরোতে গিয়ে দেখেন মিষ্টার ত্রিপাঠী দাঁড়িয়ে। মুখটা থমথমে। যেন এখুনি প্রলয় ঘটে যাবে। খুব কষ্টে বললেন
ত্রিপাঠীঃ আমার নিজের ঘরের ছেলেই যে কুলাঙ্গার বুঝতে পারিনি।
দুপুরে খাওয়ার টেবিলে
প্রফেসর বাগচিঃ খাও খাও। বাগদা চিংড়ির কিলো কত মাথায় আছে?
সমিতাঃ আহ কী হচ্ছে ? অসীম তুই কিন্তু কিছু মনে করিস না।
অসীমঃ না না জানিতো জামাইবাবু ইয়ার্কি করছেন।
প্রফেসর বাগচিঃ না ইয়ার্কি করছি না। ভেটকি, চিংড়ি, মটন । ভাইয়ের জন্য আদিখ্যেতা আমার পছন্দ নয়। আচ্ছা বলো তো গাছ কেন মরে।
সমিতাঃ এ আবার কী কথা ? গাছ কেন মরে মানে ?
প্রফেসর বাগচিঃ তাহলে বলো গাছের গোড়ায় পিঁপড়ে কেন হয় ?
সমিতাঃ সেই পিঁপড়ে ! কী ব্যাপার বলো তো মনে হচ্ছে গুটিয়ে এনেছো। সকালে ত্রিপাঠীদের ওখান থেকে ফিরে এতক্ষণ বৃষ্টির মধ্যে ছিলে কোথায়?
প্রফেসর বাগচিঃ রামশরণ চা ওয়ালার কাছে। সেই তো আমাকে দিব্য জ্ঞান দিল।
সমিতাঃ তুমি যে কী বলো না কিছুই মাথায় ঢোকে না।
প্রফেসর বাগচিঃ রাতে একটা নাটক হবে। ওই শালা , কবজি ডুবিয়ে তো খাচ্ছো। কয়েকটা কথা বললে কি এখন মগজে ঢুকবে?
অসীমঃ বলুন না
প্রফেসর বাগচিঃ এখনই ফোন করে গোয়েঙ্কা তাঁর ছেলেকে জানিয়ে দেবে কাল সকাল দশটায় বাড়িতে থাকতে। তুমি তোমার অপদার্থ ফোর্স নিয়ে উপস্থিত থেকো। আমি আর আমার সহধর্মিনী যাব। আর আজ রাতে তুমি তোমার যন্তর টা নিয়ে আমার সঙ্গে যাবে গোয়েঙ্কাদের বাড়িতে। রাত ঠিক বারোটায় পৌঁছে যাব। নাটক কতক্ষণ চলবে বলতে পারব না। কাজেই কিছু বিস্কুট নিয়ে নিও।
সমিতাঃ আমি যাব না? বললে রাতে কী একটা নাটক হবে।
প্রফেসর বাগচিঃ একটু ধৈর্য্য ম্যাডাম। কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
সমিতাঃ তাহলে অসীম আজ রাতে তুই এখানেই খেয়ে নিস। একসঙ্গেই বেরোস।
প্রফেসর বাগচিঃ রাতের মিলটাও ছাড়বে না? এই জন্যই তোমাকে শালা বলি।
পাক্কা নটায় হাজির অসীম সেন। প্রফেসর বাগচি তখন শ্রীমতির সঙ্গে রান্নায় ব্যস্ত।
সমিতাঃ আঃ তখন থেকে জ্বালাচ্ছ কেন বলো তো? অসীমের সঙ্গে বসো। আমি চিকেন পকৌড়াগুলি ভেজে নিয়ে যাচ্ছি।
প্রফেসর বাগচিঃ এত সুন্দরী বউ ছেড়ে ওই হুমদো মদ্দার সঙ্গে কী করব?
সমিতাঃ মুখের ভাষা দেখ, কী ব্যাপার বলো তো? এতো ফুর্তি প্রাণ গড়ের মাঠ। মূর্তিটা পেয়ে গেছ তাই না?
প্রফেসর বাগচিঃ পেয়ে গেছি বলব না। কিন্তু জানি মূর্তিটা কোথায় আছে?
সমিতাঃ বলো নাগো কোথায় আছে?
প্রফেসর বাগচিঃ কাল সকালে। এখন পাঠাটার জন্য জমিয়ে পাঠা রান্না কর
রাত এগারটার মধ্যেই ত্রিপাঠীদের বাড়িতে পৌঁছে গেলেন প্রফেসর বাগচি। গাড়িটা মোড়ের মাথায় রেখে হেঁটেই এসেছেন। শীতের রাত শুনশান। ত্রিপাঠীদের বাড়ির পিছনের পাঁচিল টপকে উঠে এলেন অসীম সেন আর প্রফেসর বাগচি। সঙ্গে দুজন হাবিলদার। রাত ক্রমশ গভীর হচ্ছে। কুয়াশায় কিছু দূরের দৃশ্যমানতা প্রায় শূণ্য। চারজনকে পেয়ে মহানন্দে ভোজ লাগিয়েছে মশার দল। রাত তখন দুটো। হঠাৎ করে দোতলার ত্রিপাঠীর ঘরের জানলাটা খুলে গেল। কিছু একটা বেয়ে নামল এক ছায়া মূর্তি। বাগানে এসে কিছু একটা খুঁজতে লাগলেন। হঠাৎ জ্বলে উঠল টর্চ।
প্রফেসর বাগচিঃ বাকি পরিশ্রমটা না হয় পুলিশই করবে ত্রিপাঠীবাবু।
ত্রিপাঠী চমকে উঠে পকেটে হাত ঢোকাতেই
অসীমঃ পকেট থেকে কিছু বের করার চেষ্টা করবেন না মিষ্টার ত্রিপাঠী। আমার লক্ষ্য় কিন্তু মিস হয় না।
ত্রিপাঠীঃ আপনি কিছুই প্রুভ করতে পারবেন না মিষ্টার বাগচি। ওটা আমাদের পরিবারের জিনিস।
প্রফেসর বাগচিঃ খুনের বিষয়টা ভুলে গেলেন? তা কাল সকালেই না হয় কথা হবে। অসীম তোমার লোকজনকে বলো লোকটাকে নিজেদের জিম্মায় নিতে। সাবধান ভারি ফেরেকবাজ। যা কথা সকালেই হবে। চলো বাড়ি ফেরা যাক।
(চলবে)
(ধারাবাহিকের পরবর্তী অংশের জন্য চোখ রাখুন পরের রবিবার ওঙ্কার বাংলার ‘রবিলেখা’য়)