ব্যাঙের বিয়ে
তন্ময় মণ্ডল
ঝপ করে লাফ দিয়ে গিরগিটিটা একেবারে কাদের মিঞার গা ঘেঁষে দৌড়ে পালাল ঝোপের আড়ালে। খানিকটা আঁতকে উঠে অভ্যাসবশত বুকে থু থু করল কাদের। কে যে ছোটবেলায় শিখিয়েছিল গিরগিটি দেখলে বুকে থুথু দিতে হয় তা এই বার্ধ্যকের দোড়গোড়ায় এসে মনে পড়ে না। তবে এটুকু স্পষ্ট মনে আছে থুথু না দিলে এই প্রাণী বুকের রক্ত চুষে নেয়। একথা কতটা সত্য তা কাদের জানে না। জানার প্রয়োজনও বোধ করে না। অযথা মনের মধ্যে একটা খচখচানি রেখে কী লাভ।
আজ শুক্রবার। নামাজ আদায় করে মসজিদ থেকে বেরিয়েছে সবে। গন্তব্য সুনামগঞ্জ বাজারে কৃষক সমিতির মিটিঙ। মিনিট দশেকের হাঁটা পথ।
কাদেরের তিনপুরুষ চাষা। জমি, ফসল– আল্লার এই দানেই জীবন চলে। বৃষ্টি নেই। খা খা মরশুম। উত্তরের কৃষকদের মনে এখন আতঙ্কের মেঘ ডানা ঝাপটাচ্ছে। ফুটিফাটা জমি দেখে কান্না আসে। উদ্বেগে, উৎকণ্ঠায় রাতে ঘুম নেই। তাই আজ এই মিটিঙ। এ-গ্রামে কৃষকদের আগে কোনো সমিতি ছিল না। বছর দশেক হল মিজানুর আর কমল বর্মণ এই সমিতি করেছে।
আসমানের আলো বুজে আসবে আর একটু বাদেই। লুঙ্গির কোচাটা টাইট করে বাঁধল কাদের মিঞা। সুনামগঞ্জ হাটের একেবারে মধ্যিখানে এলাকার সব চাষীরা জড়ো হয়েছে। শ্যামলদা, বাপ্পা, ইয়াসিন ভাই, মোক্তার এরা তার প্রায় সমবয়সী। কমবয়সী ছেলেও কিছু আছে। তবে এখন সমস্যা চাষার ছেলে তো আর চাষা হয় না। ফলে হাহাকার ভরা মাঠ ফাঁকা পড়ে থাকে কোথাও কোথাও। এই তো কাদেরের বড় ব্যাটা তবু মাঠের দিকে যায়; ছোটটা সেই যে শহরে পড়তে গেল আর ফেরে না। কোন এক কোম্পানির কাজ করে। মাসে একবার আসে। সে এখন শহুরে বাবু। নখের কোনায় মাটি লেগে থাকা বুড়োটিকে বাপ বলে পরিচয় দিতে হয়তো বাঁধে। তাই শহরে ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার কথাও বলে না সহজে। সবই বোঝে কাদের। বয়সের সূর্য কতরকম অভিজ্ঞতাই না দিয়ে যায়।
‘‘কী কাদের ভাই শরীর কেমন এখন?’’ পালান মণ্ডলের কথায় কাদেরের মনে পড়ল তার তো হাঁটুর ব্যথা এখনও কমেনি। তবে ফুটিফাটা মাঠের বেদনায় সে যন্ত্রণা যেন মেঘের আড়ালে সূর্যের মতো লুকিয়ে পড়েছে।
মিটিঙ চলছে। কাদের সবাইকে দেখা দিয়ে একটু দূরে এসে দাঁড়াল। পালান একটা লাল সুতোর বিড়ি ধরিয়ে এগিয়ে দিল কাদের দিকে। কাদেরের সাদা ধবধবে দাঁড়িগোফের মাঝখানের ছোট্ট গহ্বর থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরিয়ে আসছে। যেন মেঘের বীজ। একটু বাদেই আসমানে ভেসে বেড়াবে। এই বীজ, ফসল, ক্ষেত-খামারের জীবনে মেঘ যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা কৃষক ছাড়া কেই বা বোঝে !
‘‘পালান এখন ব্যাঙের বিয়েই তাইলে একমাত্র রাস্তা?’’ যেহেতু মিটিঙে এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাই সেই প্রসঙ্গ টানল কাদের।
পালান বিড়িতে একটান দিয়ে খানিকটা ধোঁয়া ছাড়ে, ‘‘কাদের ভাই এবার ফসল ভালো না হলে খাব কী? শহরে গিয়ে এই বয়সে কি কাজ পাব? ওপরওয়ালাই ভরসা।’’
এই ওপরওয়ালা শব্দটা বড় অদ্ভুত। না হিন্দুর। না মুসলমানের। সুনামগঞ্জের একটা প্রাচীন রীতি আছে। ব্যাঙের বিয়ে। যখন বৃষ্টির মাসগুলোতেও আকাশে মেঘের রেখামাত্র দেখা যায় না। যখন চাষাভুষো পরিবারের একমাত্র সম্বল মাটি যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে, এই গ্রামের চাষারা তখন ব্যাঙের বিয়ে দেয়। আকাশভর্তি মেঘের আশায়। বৃষ্টির আশায়। ফসলের আশায়। আশাই তো গরীব কৃষককে বাঁচিয়ে রাখে। কৃষক কি সব সময় ফসলের উপযুক্ত দামটুকু পায়? মুনফা তো মধ্যস্ততাকারী মানে আড়ৎ মালিকদের। তবু প্রজন্মের পর প্রজন্ম মাটিকে মা ভাবে। আগলে রাখে শষ্যের বীজ। সন্তানস্নেহে বড় করে ফসল।
শুধু সুনামগঞ্জ নয় উত্তরবঙ্গের অনেক গ্রামেই ব্যাঙের বিয়ে দেয় কৃষকরা। দুটো ব্যাঙ নির্বাচন করা হয়। একটি পুরুষ ব্যাঙ আর একটি তার কনে। মানুষের বিয়ের মতোই ধুমধাম করে সারা গ্রামের লোক খাইয়ে বৃষ্টিদেবতার কাছে আকুতি জানায় কৃষকরা। বছর চারেক আগেও সুনামগঞ্জে ব্যাঙের বিয়ে পর বৃষ্টি এসেছে।
কাদের মিটিঙে বসে আছে। আলোচনায় যোগদানও করছে। তবে ভেতরটা খচখচ করছে অন্য কারণে। আজ মসজিদের ওই ঘোষণার পর এখানে আসা কতটা ঠিক হল কে জানে! ঘরে দু-দুটো যুবতী মেয়ে। অবশ্য অনেকেই তো এসেছে। সবাই কথা বলছে। কাদেরও। তবে মাঝে মাঝে একটা অন্যমনষ্কতা কেমন যেন ঠাণ্ডা চাদরের মতো ঘিরে ধরছে।
মৌলবী সাহেব স্পষ্ট জানিয়েছেন। এইসব ব্যাঙের বিয়েটিয়ে ইসলামবিরুদ্ধ। তাই কোনো সাচ্চা মুসলমানের সন্তান ব্যাঙের বিয়েতে যাবে না। যদি কেউ যায় মসজিদ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কাদের মনে মনে ভেবেছে মিটিঙে তো যেতেই পারে বিয়েতে যাবে কি না তা ভাবার জন্য সময় আছে। বাকি যারা এসেছে তারাও হয়তো একথাই ভেবেছে। অথচ সুনামগঞ্জে এইরকম ঘটেনি এর আগে। নতুন মৌলবী সাহেব একটু কড়া। তিনি এসে নিয়মের গেরো খানিকটা কষে বেঁধেছেন।
তখন কাদেরের কতই বা বয়স দশ-বারো। তার আব্বাই তো ব্যাঙের বিয়ের সব আয়োজন করেছিলেন। তিনি ছিলেন মোড়লগোছের মানুষ। গ্রামে সবাই খুব মানত। আব্বা বলতেন, ‘‘এই ব্যাঙই তো আল্লার সেই বান্দা যে বৃষ্টি ডেকে আনে। এই ব্যাঙই তো চাষার সাচ্চা দোস্ত। ব্যাঙ মারবি না কখনও।’’ কাদের ভাবে চার বছর আগেও মুসলমানরা দিব্যি গেছে। ব্যাঙের বিয়ে। খাওয়াদাওয়া। আনন্দ। গ্রাম ভেসে যায় যায় বৃষ্টিতে। হঠাৎ কী যে হল! তবে মৌলবীর আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা কি কাদের মিঞার আছে?
মিটিঙ শেষ। বাকি সবার মতো কাদেরও দুশো টাকা চাঁদা দিল। আগামী পরশু ব্যাঙের বিয়ে দেওয়া হবে সুনামগঞ্জ বাজারের ডানদিকে বলখেলার মাঠে। কাদের লক্ষ করল চাঁদা সবাই দিল ঠিকই কিন্তু মুসলমানরা কেউ বিয়ের কোনো দায়িত্ব নিল না।
সন্ধে নামছে। হাটের দোকানগুলোয় আলো জ্বলছে একে একে। বাড়ির পথে রওনা হল কাদের মিঞা। বুকে একটা বিরাট পাথর চেপে আছে। কঠিন কোনো দ্বিধার প্রাচীরে আটকা পড়েছে সে। কাদেরের মনে হল ইয়াসিন, মোক্তার তারা কী করবে একটু কথা বলে দেখলে হয়। হাটের মুখ থেকে যে রাস্তাটা রাইসমিলের দিকে গেছে, সেদিকেই বিড়ি টানতে টানতে এগোচ্ছে ইয়াসিন। মোক্তার সহ আরো দুজন আছে সঙ্গে। কাদের এগিয়ে যায়, ‘‘ইয়াসিন ভাই দুটো কথা আছে। একটু সাইটে আসো।’’
ইয়াসিন হাতের বিড়ি ফেলে এগিয়ে আসে, ‘‘বলো কাদের মিঞা। চোখ মুখ শুকনো কেন?’’
‘‘ব্যাঙের বিয়েতে তুমি আসবা? মসজিদের ঘোষণা শোনো নাই?’’
‘‘শুনছি তো। বিয়েতে আসব না। মিটঙে না আসলে ফসল বেঁচা মুশকিল হবে। তাই আসলাম।’’
‘‘কিন্তু বিয়েতে না গেলে যদি বৃষ্টি না হয়?’’
‘‘কী যে বলি কাদের। আমিও জানি বিয়েতে যদি সব চাষারা না যায় সে গ্রামে বৃষ্টি হবে না। আমার আব্বা-চাচারা তো তাই বলত। এদিকে আম্মার শরীরটা ভালো নাই সামনের মাহিনায় বেটির নিকাহ।’’
কাদের স্পষ্ট খেয়াল করল তার উদ্বেগের মেঘ ইয়াসিনের আকাশেও ডানা ঝাপটাচ্ছে। কিন্তু মৌলবীর বিরুদ্ধে যাওয়া মানে তো ধর্মের বিরুদ্ধে যাওয়া। সে সাহস সামান্য কৃষকদের কি আছে? কাদের যা বুঝল তাতে মুসলমানরা কেউ যাবে না ব্যাঙের বিয়েতে।
আজ সকাল থেকে রোদের তেজ প্রবল। যেন আগুন নেমে আসছে আসমান থেকে। বিকেলে ব্যাঙের বিয়ে বলখেলার মাঠে। সুনামগঞ্জের প্রাচীন লোকাচার এই বিয়ে। ত্রিপল টাঙিয়ে বিয়ের মণ্ডপ তৈরি হয়। আর সেখানেই আনা হয় আট দশটা বড় বড় হাড়ি। বর ব্যাঙ আর বউ ব্যাঙকে বিয়ে দেওয়ার পর বড় হাড়ির ভেতর খানিকক্ষণ রাখা হয়। প্রত্যেকটা হাড়ির ভেতর মিনিট পাঁচেক থাকার পর ব্যাঙদুটোকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর ওই হাড়ির জল প্রত্যেক চাষা তার জমির চারপাশে ছিটিয়ে দেয়। তাদের বিশ্বাস এই পানিই আকাশের পানিকে ডেকে আনে। ব্যাঙের বিয়ের রাত পেরোবার আগেই সেই জল জমির চার কোনায় ছেটানোর নিয়ম।
সকাল থেকে তোলপাড় চলছে কাদেরের মনে। নামাজ পড়ছে দোয়া করছে বৃষ্টির জন্য। আমিনা ওষুধ খাওয়ার কথা বলল। এই ভালো কথাও সহ্য হচ্ছে না। মাঠে গিয়ে বসল কাদের। মাটির ওপর সন্তানস্নেহে হাত বোলাচ্ছে। সন্ধে অবধি আসমানের দিকে চেয়ে বসে থাকল মাঠের আলে। সে ভালো করেই জানে এবার ফসল ভালো না হলে জমি বেঁচতে হবে। জমানো টাকায় বেশিদিন সংসার চলবে না। চারটে গরু ছিল। এখন দুটোয় এসে ঠেকেছে।
হাঁটুর ব্যথার জন্য সাইকেল চালাতে বেগ পেতে হয়। তবু বাড়ি ফিরে লড়ঝরে সাইকেলটা অনেকদিন পর বের করল কাদের মিঞা। কাউকে কিছু না বলে একটা বোতল ব্যাগে পুরে সাইকেলের হ্যান্ডেলে বাধিয়ে রওনা দিল।
মাইকে গান ভেসে আসছে। আর একটু গেলেই বলখেলার মাঠ। কিন্তু যাওয়া কি ঠিক হবে? একবার ফিরে যাওয়ার কথা ভাবল কাদের। কী মনে হল সাইকেলটা রেখে একটু দূর থেকেই চোখ চালিয়ে নিল। মুসলমানদের কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ দেখল তার ভাই মনসুরের ছোটছেলে একটা বড় ব্যাগ নিয়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে। কাদেরকে দেখে চমকে উঠল ভুত দেখার মতো।
খানিকটা জড়তা নিয়েই বলল, ‘‘আসসালাম ওয়ালাইকুম চাচা।’’ দুবছর বাদে ছেলেটা কথা বলল। জমি বিবাদের জেরে প্রায় মুখ দেখাদেখি বন্ধ।
ছেলেটি আবার বলল, ‘‘চাচা আমি আমি তিন বতল এক্সট্রা পানি নিছি। আপনি একটা নেন।’’
‘‘তুই যে আসলি কেউ জানলে তো মসজিদ থেকে একঘরে করে দেবে!’’ অনেকক্ষণ সাইকেল চালিয়ে আসায় দমের কষ্ট হচ্ছে কাদেরের। তাই একটু থেমে থেমে বলল।
‘‘চাচা আমি চলে যাব কাল ভোরে। কেরালায় কাজ পেয়েছি সুপারভাইজারের। কেউ জানবে না।’’
‘‘তোর আব্বা জানে তুই এখানে?’’
‘‘ওই তো আব্বা’’ দূরে অন্ধকারের দিকে আঙুল উঁচু করল মনসুরের ছেলে।
দুজনে এগিয়ে গেল সেই অন্ধকারের দিকে। সাধারণত বাজারে দেখা হলেও মনসুর এড়িয়ে যেত কাদেরকে। দুবছর পর আবার মুখোমুখি দাঁড়াল। আশপাশে একবার চোখ বোলাল কাদের। কেউ নেই। দূর থেকে গান আর মানুষের কোলাহল হালকা ভেসে আসছে।
আকাশ এখনও পরিষ্কার। মুখোমুখি একই মায়ের পেটের দুই ভাই। কেউ কোনো কথা বলল না। হঠাৎ মৃদুস্বরে ভাইজান বলে কাদেরকে জড়িয়ে ধরল মনসুর। হাউহাউ করে কাঁদছে। কাদেরের চোখের অন্দরমহলে মেঘ জমছে। বৃষ্টি আসতে খুব বেশি দেরি নেই।