ওঙ্কার ডেস্ক: কলকাতায় সাম্বা। কলকাতায় ইতিহাস। যে ব্রাজিলের খেলা দেখার জন্য গোটা কলকাতা, গোটা বাঙালি জাতি অপেক্ষা করে থাকে। ৪ বছর পরে বিশ্বকাপের দিকে দেশের জন্য গলা ফাটায়। সেই ব্রাজিলই হাতের কাছে। আর প্রতিপক্ষ কলকাতার নিজের দেশ। ভারত বনাম ব্রাজিল আর ভবিষ্যতে কোনও দিন এই ছবি আসবে কিনা কেউ জানে না। আর এই ইতিহাসের সাক্ষীর ম্যাচে কিনা দর্শকদের উন্মাদনা পাগলামি থাকলেও সাধ আর সাধ্যর মধ্যে যে অনেক ফারাক। ফ্রি টিকিট ফুটবল কর্তাদের মধ্যে কার্যত নেই। যুবভারতীতে ৪ নম্বর গেটের সামনে টিকিট বিক্রি হচ্ছে দাম ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। সেখানে কার্যত মাছি উড়ছে।
পর্যবেক্ষকদ্দের মতে, ক্রিকেট হলে এই ৪ -৫ হাজার টাকার টিকিটের বহুগুন দাম বেশি হলেও যে কোন আইপিএল ম্যাচে মানুষ টিকিট ব্ল্যাকে কেনে। সেখানে ব্রাজিলের হলুদ প্রেমে এতো অনাগ্রহ কেন মানুষের! শুধু মেসিকে একবার দেখার জন্য তো আরও বেশি দামের টিকিট কলকাতার ফুটবল প্রেমীরা কিনেছিল। সেখানে ব্রাজিল প্রেম এতো কম কেন! পুজোর আমেজে বাঙালির ফুটবল আবেগে কি ধাক্কা? শনিবার যুবভারতী হাউসফুল হলে সেটা এক প্রকার চমৎকারই হবে। যদি না কম দামের বেশি দামের টিকিট গুলো বিক্রি হয়। ভিনিসিয়াসদের দেখার জন্য মাঠ না ভরলে নতুন গেরুয়াকরণে সাজা যুবভারতীর জন্য হবে একটা লজ্জার বিষয়। তেমনই খারাপ অবস্থা ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের মিডিয়া দলের কার্ড তৈরীর সময় নানা নিয়ম থাকলেও সেই নিয়ম বজায় রাখতে পারল না তারা। ফলে ম্যাচের দিন সকালে মাঠে ঢোকার কার্ড হাতে পাবে মিডিয়া।
পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের সামনে র্যাঙ্কিংয়ে ১৩২ ধাপ পিছিয়ে ভারত। কাগজে-কলমে ব্যবধানটা তাই বিশাল। কিন্তু ফুটবল তো শুধু র্যাঙ্কিংয়ের হিসাব মেনে চলে না। পানামার বিরুদ্ধে ১-১ ড্রয়ে যে লড়াইয়ের ছবি দেখিয়েছিল ভারত, সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই যুবভারতীতে নামতে প্রস্তুত খালিদ জামিলের দল। ব্রাজিলের নামেও ভয় নয়, নিজেদের ফুটবলেই বিশ্বাস খালিদের। পানামার বিরুদ্ধে ম্যাচের ফল ভারতীয় শিবিরকে হয়তো পুরোপুরি তৃপ্ত করতে পারেনি। জয় আসেনি, ম্যাচ শেষ হয়েছিল ১-১ ড্রয়ে। কিন্তু সেই ম্যাচে ভারতীয় দলের পারফরম্যান্সে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় ভরসা।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ভারতের থেকে ৯৪ ধাপ এগিয়ে থাকা পানামার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই লড়াই করেছিল ভারত। ম্যাচের পর খালিদ নিজেই জানিয়েছিলেন, তাঁর মেয়াদে সেটি ছিল অন্যতম সেরা ম্যাচ। এ বার সামনে আরও বড় পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ ব্রাজ়িল। র্যাঙ্কিংয়ে ভারতের থেকে ১৩২ ধাপ এগিয়ে থাকা পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কিন্তু প্রতিপক্ষের বিশাল নামের দিকে তাকিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা বদলাতে চান না খালিদ। ভারতীয় দলের কোচ বলেন, ‘আমরা এ ভাবে ভাবছি না। ওরা বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। আমরা জানি, রক্ষণে ওরা খুবই শক্তিশালী ও আক্রমণেও খুব ভালো। আমরা যদি ওদের খেলার একটা দিকে নজর দিই, তা হলে অন্য দিকটার উপরও আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। তাই গোটা ম্যাচেই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কারণ ওদের দল হাইপ্রোফাইল, অনেক গুণসম্পন্ন ফুটবলার রয়েছে।’
ব্রাজিল যে শুধু একজন তারকার উপর নির্ভরশীল নয়, সেটাও পরিষ্কার করে দিয়েছেন খালিদ। ভিনিসিয়াস, রদ্রিগো কিংবা অন্য কোনও তারকাকে আটকালেই যে ব্রাজ়িলকে থামিয়ে দেওয়া যাবে না, সেটা ভালো ভাবেই জানে ভারতীয় শিবির। তাই খালিদ বলেছেন, ‘ওরা শুধু এক জন ফুটবলারের উপর নির্ভরশীল নয়। প্রত্যেক ফুটবলারই ভালো, এমন কী যারা পরিবর্ত হিসেবে নামবে, তারাও। এখানে ওরা অনেক ফুটবলারকে ঘুরিয়ে খেলাবে। তাই ওরা ঠিক কী করবে, সেটা আগে থেকে অনুমান করা খুব কঠিন।
ব্রাজ়িলের মতো দলের বিরুদ্ধে মাঠে নামলে চাপ থাকবেই। ভয়ও থাকবে। কিন্তু সেই ভয়কে নিয়েই মাঠে নেমে নিজেদের দায়িত্ব পালন করার বার্তা দিয়েছেন খালিদ। তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোনও ফুটবলার যেন প্রতিপক্ষের নাম দেখে নিজের স্বাভাবিক খেলাটা ভুলে না যান। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, ভয় থাকবে। চাপও থাকবে। আমাদের সেই চাপ সামলাতে হবে। মাঠে নেমে নিজেদের সেরাটা দিতে হবে। যে দায়িত্বটা যে ফুটবলারকে দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়েই ভাবতে হবে ও সহজ ফুটবল খেলতে হবে।’ব্রাজিল কোচ কাল আনসেলোত্তি সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে ভারতের কোচ খালিদ জামিলকে জড়িয়ে ধরলেন। একইসঙ্গে বুঝিয়ে দিলেন ভারতীয় ফুটবলের সঙ্গে তিনি ওয়াকিবহল ২০০২ থেকে ব্রাজিল বিশ্বকাপ না জিতলেও প্রতিটা ম্যাচ কিন্তু তারা জেতার জন্যই খেলে। ব্রাজিল কোচ বললেন , ‘ভারতের রায়ান উইলিয়ামসের যথেষ্ট গতি রয়েছে। প্রতিপক্ষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন তিনি। পানামার বিরুদ্ধে ভারতের ম্যাচটা দেখেছি। পানামা ভাল দল। ওদের আক্রমণভাগও যথেষ্ট গতিশীল। আমরা ভারতীয় দলের প্রতি সম্মান রেখেই তাদের শক্তি, গুণমান এবং খেলোয়াড়দের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করছি। প্রতিপক্ষকে সবসময়ই সম্মান করতে হয়। আর এই ক্ষেত্রে সেই প্রতিপক্ষ ভারত। আমরা ভারতকে যথেষ্ট গুরুত্ব ও সম্মান দিয়েই এই ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
ফিফা ক্রমতালিকায় টিম ইন্ডিয়া অনেক পিছিয়ে থাকলেও শনিবারের ম্যাচকে কোনওভাবেই ‘সহজ’ ম্যাচ হিসেবে দেখছে না ব্রাজিল। জানিয়ে দিলেন, ‘ব্রাজিল জাতীয় দলের কাছে কোনও ম্যাচই কখনও ‘ফ্রেন্ডলি’ ম্যাচ নয়। এই ম্যাচও আমাদের কাছে সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নতুন একটা চক্রের শুরুতে রয়েছি, নতুন ফুটবলারদের নিয়ে দল তৈরি করছি।’
ব্রাজিল থেকেও ভারতের ফুটবল সংস্কৃতি নিয়ে মুখ খুলেছিলেন কার্লো। এদিনও সেই একই সুরে জানিয়ে দিলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষ ফুটবলকে কতটা ভালবাসেন সেটা আমরা ভাল করেই জানি। ভারতে আসা আমারও এই প্রথম। আমি মনে করি, ভারতের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ফুটবল এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলা নয়। তবে তার মানে এই নয় যে ফুটবলের কোনও গুরুত্ব নেই। তবে ক্রিকেটের সঙ্গে এখানকার মানুষ অনেক বেশি পরিচিত সেটাই তাঁদের কাছে বেশি জনপ্রিয়।’এদিকে দীর্ঘদিন ব্রাজিল জার্সিতে খেলছেন দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সিতে খেলছেন মারকুইনহোস। কিন্তু ভারতে এসে সমর্থকদের এমন ভালবাসা তাঁর কাছেও নতুন অভিজ্ঞতা। মারকুইনহোস বলেন, “ভক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাঠে ভাল পারফর্ম করা, দারুণ ম্যাচ খেলা, জয় পাওয়া এবং নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স উপহার দেওয়া।”
ভারতে এটাই তাঁর প্রথম সফর। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ব্রাজিলের এই তারকা বলেন, “সত্যি বলতে, ব্রাজিল জাতীয় দলকে স্বাগত জানাতে এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে এই মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে এখানকার মানুষের যে ভালবাসা ও আগ্রহ, তা দেখে আমি অভিভূত।” আলাদা করে গুরপ্রীত সিং সান্ধুর কথা উল্লেখ করেছেন মারকুইনহোস। তিনি বলেছেন, ”আমি গুরপ্রীতের খেলা অনুসরণ করেছি। এটা ওর ৯০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ, যা সত্যিই অসাধারণ এক মাইলফলক।”
ভারতীয় সমর্থকদের এই ভালবাসা ব্রাজিল দলের খেলোয়াড়দের আরও অনুপ্রাণিত করবে বলেও মনে করেন মারকুইনহোস। তার কথায়, এই আবেগই তাঁদের আরও ভাল করার জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগাবে। মারকুইনহোস বলেন, “সমর্থকদের ভালবাসা আমাদের এগিয়ে যেতে, লড়াই চালিয়ে যেতে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে অনুপ্রেরণা দেয়, যাতে ব্রাজিল জাতীয় দল আবার তার জায়গায় ফিরে যেতে পারে।” বিশ্বকাপের পর ভারতে আসার অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন মারকুইনহোস। তাঁর মতে, এমন অভিজ্ঞতা পুরো পথচলায় দলের সঙ্গে থেকে যায়। ভারত যে ব্রাজিলের অন্যতম বড় সমর্থকভূমি, সেটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। মারকুইনহোস বলেন, “ব্রাজিলের বাইরের যেসব দেশের মানুষ আমাদের অনুসরণ করেন, তাদের মধ্যে ভারত নিঃসন্দেহে অন্যতম বৃহৎ সমর্থকগোষ্ঠীর দেশ।আমরা ব্রাজিলের সমর্থকদের সঙ্গেও আবার সংযোগ স্থাপন করতে চাই। আর তার অর্থ হল মাঠে ভাল ফলাফল করা এবং এই জার্সির মর্যাদা যথাযথভাবে তুলে ধরা।”