ওঙ্কার ডেস্ক: চিনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে ইয়ারলুং সাংপো নদীর উপর প্রস্তাবিত বিশাল জলবিদ্যুৎ বাঁধ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে ভারতে। এই নদীই ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের পর ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত এই বাঁধটি নির্মিত হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিবেশ, নদী-নির্ভর জীবনযাত্রা এবং সামগ্রিক জল নিরাপত্তার উপর।
চিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিব্বতের গভীর গিরিখাতে নদীর বিপুল উচ্চতা পতনকে কাজে লাগিয়ে একাধিক সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। প্রকল্পটির আর্থিক পরিসর অত্যন্ত বড় এবং এটি চিনের শক্তি উৎপাদন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। বেজিংয়ের দাবি, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে এবং ভাটির দেশগুলির উপর কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
তবে ভারতের বিশেষজ্ঞ মহল ও উত্তর-পূর্বের রাজ্য প্রশাসনের আশঙ্কা ভিন্ন। ব্রহ্মপুত্র নদী শুধু একটি জলধারা নয়, বরং আসাম ও অরুণাচল প্রদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা, কৃষি, মৎস্যচাষ এবং সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে সামান্য পরিবর্তন হলেও তার প্রভাব পড়তে পারে পলিমাটির গঠন, চাষযোগ্য জমির উর্বরতা এবং জীববৈচিত্র্যের উপর। বিশেষ করে বর্ষাকালে জল ছাড়ার ধরনে হঠাৎ পরিবর্তন হলে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না পরিবেশবিদরা।
অরুণাচল প্রদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই বাঁধকে ‘জল বোমা’ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে কোনও কৌশলগত পরিস্থিতিতে চিন যদি জল আটকে রাখে বা হঠাৎ বিপুল জল ছেড়ে দেয়, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের ভাটির অঞ্চলে। এই প্রকল্পের অবস্থানও কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল, কারণ এটি ভারত-চিন সীমান্তের খুব কাছাকাছি একটি অঞ্চলে অবস্থিত।
শুধু ভারত নয়, তিব্বতের স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং সেখানকার ভঙ্গুর পার্বত্য বাস্তুতন্ত্রের উপরও এই প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বড় বাঁধ নির্মাণের ফলে স্থানচ্যুতি, ভূমিধস এবং ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকার জানিয়েছে, বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় নিজস্ব জলবিদ্যুৎ ও নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পগুলিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি বড় পরীক্ষা।
