কোলন ক্যান্সারকে সাধারণভাবে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার বলা হয়। এটি আমাদের বৃহদান্ত্রের কোলন অথবা তার শেষ অংশ রেকটাম/মলাশয়ে হওয়া ক্যান্সার। সাধারণত অন্ত্রের ভেতরের আবরণে ছোট একটি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা পলিপ তৈরি হওয়া থেকে অনেক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। সব পলিপ ক্যান্সারে পরিণত হয় না, তবে কিছু ধরনের পলিপ সময়ের সঙ্গে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। তাই সময়মতো পরীক্ষা করে পলিপ শনাক্ত ও অপসারণ করা ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ।
কোথায় এবং কীভাবে হয়?
আমাদের পরিপাকতন্ত্রে খাবার পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্র পার হওয়ার পর বৃহদান্ত্রে আসে। বৃহদান্ত্রের প্রধান অংশ হলো কোলন, আর তার শেষ অংশ হলো রেকটাম, যেখান থেকে মলদ্বারের মাধ্যমে মল বের হয়। এই কোলন বা রেকটামের কোষ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে, তখন ক্যান্সার তৈরি হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া পরিবারের কারও কোলন ক্যান্সার বা পলিপের ইতিহাস, কিছু বংশগত রোগ, দীর্ঘদিনের প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস এবং বেশি লাল মাংস ও কম ফল-সবজি খাওয়াও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
কোলন ক্যান্সারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের কোনো লক্ষণই থাকে না। তাই শুধু শরীরে সমস্যা দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী স্ক্রিনিং করা গুরুত্বপূর্ণ।
সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
মলত্যাগের অভ্যাসে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন—বারবার ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য।
মলের সঙ্গে বা মলের ওপর রক্ত দেখা যাওয়া।
মল আগের তুলনায় সরু হয়ে যাওয়া।
মলত্যাগ করার পরও পেট পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি এমন অনুভূতি।
দীর্ঘদিন পেটে ব্যথা, মোচড় বা অস্বস্তি।
অকারণে ওজন কমে যাওয়া।
অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি।
শরীরে আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতা, বিশেষ করে দীর্ঘদিনের অদৃশ্য রক্তক্ষরণের কারণে।
তবে এই লক্ষণগুলোর অর্থ যে ক্যান্সার হয়েছে, তা নয়—পাইলস, সংক্রমণ বা অন্য অনেক রোগেও একই ধরনের সমস্যা হতে পারে। কিন্তু মলের সঙ্গে রক্ত, দীর্ঘস্থায়ী মলাভ্যাসের পরিবর্তন, অকারণে ওজন কমা বা দীর্ঘদিনের পেটের সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়?
শতভাগ নিশ্চিতভাবে কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস গড়ে তোলা যায়—
১. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।
দীর্ঘ সময় বসে থাকা কমিয়ে নিয়মিত হাঁটা বা অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস করুন।
২. স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
৩. খাবারে শাকসবজি ও ফল রাখুন।
সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়িয়ে চলুন।
৪. ধূমপান বন্ধ করুন।
তামাক ব্যবহার কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৫. অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন বা সীমিত করুন।
অ্যালকোহল গ্রহণ কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের একটি ঝুঁকির কারণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা—স্ক্রিনিং
কোলন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উপসর্গ না থাকলেও পরীক্ষা করে পলিপ বা প্রাথমিক ক্যান্সার ধরা পড়তে পারে। কিছু স্ক্রিনিং পরীক্ষায় পলিপ ধরা পড়লে সেটি ক্যান্সারে পরিণত হওয়ার আগেই অপসারণ করা সম্ভব।
অনেক আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় গড় ঝুঁকির প্রাপ্তবয়স্কদের ৪৫ বছর বয়স থেকে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের স্ক্রিনিং নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কোন পরীক্ষা কত ঘন ঘন করতে হবে তা ব্যক্তির বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে।
স্ক্রিনিংয়ের মধ্যে মলের রক্ত পরীক্ষা, কিছু ধরনের মল পরীক্ষা, সিগময়েডোস্কোপি এবং কোলোনোস্কোপি রয়েছে। কোনটি আপনার জন্য উপযুক্ত তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
বিশেষ সতর্কতা: পরিবারের নিকট আত্মীয়ের কোলন ক্যান্সার বা পলিপের ইতিহাস থাকলে, অথবা Crohn’s disease/ulcerative colitis-এর মতো প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ কিংবা কিছু বংশগত সিনড্রোম থাকলে সাধারণ মানুষের তুলনায় আগে বা বেশি ঘন ঘন স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা
কোলন ক্যান্সার অনেক সময় নীরবে শুরু হয়। তাই লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে ঝুঁকি অনুযায়ী স্ক্রিনিং, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন, ধূমপান পরিহার এবং অ্যালকোহল সীমিত করা—এই অভ্যাসগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর মলের সঙ্গে রক্ত, দীর্ঘদিনের মলাভ্যাসের পরিবর্তন, অকারণে ওজন কমা বা দীর্ঘস্থায়ী পেটের সমস্যা দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মনে রাখবেন: কোলন ক্যান্সার যত তাড়াতাড়ি শনাক্ত হয়, চিকিৎসার সুযোগ তত বেশি থাকে।