ব্রাসিলিয়া: সমস্ত সমীক্ষা ভুল প্রমাণ করে ফের ইতিহাস গড়লেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ব্রাজিলের রানঅফ নির্বাচনে পিছিয়ে থেকেও ছেলে ফ্লাভিও বোলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থবারের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন ৮০ বছরের এই বর্ষীয়ান বামপন্থী নেতা। লাতিন আমেরিকা জুড়ে দক্ষিণপন্থী হাওয়ার মাঝে লুলার এই জয় ট্রাম্পবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে বিশিষ্টমহলের একাংশ।
দেশের নির্বাচনী আদালত জানিয়েছে, লুলা পেয়েছেন ৫১.৮ শতাংশ ভোট, ফ্লাভিও বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২ শতাংশ। ভোটার দমনের অভিযোগ এবং শেষ মুহূর্তে ভোটের সময় বাড়ানো নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই রবিবার এই ফলাফল ঘোষণা হয়। ব্রাজিলের দরিদ্রতম উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভোটাররা শেষবেলায় লুলার পাশে দাঁড়িয়েই তাঁকে সমর্থন করেন।
তবে ফল ঘোষণার পরই টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ফ্লাভিও বোলসোনারো ভোট বাতিলের দাবি তুলেছেন। বিনিয়োগকারীরা বোলসোনারোর জয়ের বাজি ধরেছিলেন আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরার আশায়। এই পরিস্থিতিতে লুলার অপ্রত্যাশিত জয় এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় সোমবার বাজারে বড় ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক থমাস ট্রাউম্যানের মতে, এটি লুলার প্রতি ভোটের চেয়ে বিকল্পকে প্রত্যাখ্যানের ভোট। তাঁর কথায়, এটি ছিল রাস্তায় তরুণদের এবং সোশাল মিডিয়ায় নবনির্বাচিত কংগ্রেস সদস্যদের প্রচার, প্রচলিত প্রচারের বাইরে গিয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। গতকাল ফল ঘোষণার পর সাও পাওলোতে সমর্থকদের উদ্দেশে লুলা বলেন, এই নির্বাচন তাঁকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে, তিনি দেশ পরিচালনার ধরণ বদলাবেন।
৮০ বছর বয়সে দেশের সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে লুলার সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ দেশ গভীরভাবে বিভক্ত, একদিকে ট্রেড ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা লুলার প্রগতিশীল পরিচয়, অন্যদিকে পিতৃতান্ত্রিক রক্ষণশীলতা ও অবাধ পুঁজিবাদ। অর্থনীতিতেও ঘাটতি, ঋণ এবং উচ্চ সুদের হার বড় সমস্যা। সাধারণ মানুষের ঋণ খেলাপি গত দুই দশকে সর্বোচ্চ।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে লুলার জনপ্রিয়তা ছিল ৮৩ শতাংশ, বারাক ওবামা তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ বলেছিলেন। পরে দুর্নীতি কাণ্ড ও জেলযাত্রায় সেই ভাবমূর্তিতে দাগ লাগে। এবার প্রথম রাউন্ডে ৪ অক্টোবর হেরে গিয়েছিলেন লুলা। ১৯৮৯ সালে গণতন্ত্র ফেরার পর দ্বিতীয় স্থানে থেকে কেউ রানঅফে জেতেনি, তাই বোলসোনারো শিবির জয় নিশ্চিত ধরে নিয়েছিল। কিন্তু শেষ ১৫ দিনে বোলসা ফ্যামিলিয়া ভাতা বৃদ্ধি, অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ, ব্যক্তিগত ঋণ পুনর্গঠন এবং সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ওজন কমানোর ইনজেকশন বিতরণের মতো পদক্ষেপ করে ভোটারদের মন জেতেন লুলা।
তৃতীয় মেয়াদে বেকারত্ব ৫.৪ শতাংশে নামিয়ে আনা, আমেরিকার চেয়ে বেশি বৃদ্ধি এবং ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর মতো সাফল্য থাকলেও মূল্যবৃদ্ধিতে তাঁর জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছিল। এবার তিনি আর্থিক শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে সামাজিক প্রকল্প বাদ দিয়ে নয়।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির মুখেও নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন লুলা। পরে ২০২৫ সালে রাষ্ট্রসংঘে ট্রাম্পের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সাক্ষাৎ হয়। লুলার এই জয় ব্রাজিল ও মেক্সিকোকে বামপন্থী ঘাঁটি হিসেবে টিকিয়ে রাখল। এখন তাঁর সামনে খনিজ নীতি, কংগ্রেস, কৃষি লবি এবং সুপ্রিম কোর্টের মতো ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিকে সামলানোর কঠিন পরীক্ষা।