তাপস মহাপাত্র
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন মহলের সবাই যে সংঘাতের পথে হাঁটতে চাইছেন, তা নয়। ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্কের পক্ষে যারা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন রাষ্টপতি মির্জা ফখরুল, যিনি বিএনপির পূর্বতন সাধারণ সম্পাদকও। ফলে দলের মধ্যে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।
গত সপ্তাহের কয়েকটা দিন এমন মনে হয়েছিল যে, তারিক রহমানের নয়াদিল্লি সফরটি অবশেষে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। শোনা গিয়েছিল, ব্রিকস সম্মেলনের আগে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে এই সফরের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়েছে। উভয় তরফে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গিয়েছিল। মনে করা হচ্ছিল, তারিক রহমানের ভারত সফর বাস্তবায়িত হতে চলেছে। অন্তত রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া গিয়েছিল। যদিও তা পরে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকা ও কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, শেষ মুহূর্তে পুরো বিষয়টি ভেস্তে যায়।
এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। যা দেখা গেছে তা হল- সিদ্ধান্ত বদল এবং বিভ্রান্তি। সূত্র বলছে, পর্দার আড়ালের আলোচনা থেমে থাকেনি, তবে সফরটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। আর এর মূল কারণ ঢাকার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। এক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বা প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ তাকে ফেরত চায়। রবিবার এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এই প্রত্যর্পণের দাবিকেই তারিক রহমানের সফরের শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে প্রত্যর্পণের এই দাবি একটি গভীরতর সমস্যারও ইঙ্গিত দেয়। ভারতের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করা হবে—এ বিষয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে এখনো কোনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো সরকারের ওপর ক্রমশ কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।
এদিকে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ এবং এনসিপি-র প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বলেছেন, প্রত্যর্পণ সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়। তিনি ‘গণতান্ত্রিক দক্ষিণ এশিয়া’-র কথা বলেছেন এবং বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অভিন্ন—এই ধারণাটিও খারিজ করে দিয়েছেন।
৫ আগস্ট দিল্লিতে হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াকে কটাক্ষ করে নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, সরকারের অবস্থান ছিল অত্যধিক নমনীয়। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই মন্ত্রণালয়টি বেশ কঠোর ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে। যার মধ্যে রহমানের প্রস্তাবিত সফরের শর্তাবলিও উঠে আসে।
এমন পরিস্থিতিতে দিল্লির সঙ্গে ঢাকা কীভাবে আচরণ করবে, তা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও মতপার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং সে দেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান—উভয়েই বাংলাদেশের ভারত-নীতি নির্ধারণে যুক্ত থাকলেও, জনসমক্ষে তাঁদের অবস্থান সবসময় একই অভিমুখে ছিল বলে মনে হয়নি। জানা গেছে, ৩ আগস্ট ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যখন কবিরের সঙ্গে দেখা করেন, তখন হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি আগের বিবৃতির তুলনায় অনেক জোরালোভাবে উত্থাপন করেন তিনি।
এদিকে, দীনেশ ত্রিবেদী উভয় ক্ষেত্রেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। এই মাসে তিনি বিদেশমন্ত্রী ও কবিরের সঙ্গে দেখা করেছেন। ঢাকায় তাঁর উপস্থিতিও ক্রমেই বাড়ছে। গত সপ্তাহে রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরপরই তিনি দ্রুত দিল্লি ফিরে যান। যতদূর জানা গেছে, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও কথা হয়েছে দিনেশ ত্রিবেদীর। তবে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক মহলে একটি বাস্তববাদী চিন্তাধারাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রক ও আমলাতন্ত্র বারবার এমন সব বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছে, যেখান থেকে বুঝে নিতে অসুবিধা হচ্ছে না যে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ঢাকা। রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওঠানামা সত্ত্বেও ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা যে প্রয়োজন, এ বিষয়ে ভুল করছে না বাংলাদেশ। যার মধ্যে অন্যতম হলো অবৈধ অভিবাসন সমস্যা এবং দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর ব্যবস্থাপনা। গঙ্গা পানি চুক্তিটি আরও জরুরি একটি বিষয়। ডিসেম্বরে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে, অথচ এর মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট পথ তৈরি হয়নি—বিশেষ করে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী এখনও একে অপরের সঙ্গে আলোচনায় বসেননি।
ঢাকার একটি সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে নয়াদিল্লি হাসিনাকে ভারত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখতে না পারায় তারা হতাশ। তাদের যুক্তি হল, হাসিনা ব্যক্তিগত নাগরিক হিসেবে ভারতে অবস্থান করতেই পারেন, কিন্তু তাঁকে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখা বা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনকে ভারত যে “ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান” হিসেবে অভিহিত করেছে, তা ঢাকাকে খুব একটা সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
ভারতের দিক থেকেও তাদের ভাষায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। মঙ্গলবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘পারস্পরিক আদান-প্রদান-এর আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। এর অর্থ হল, বিনিময়ে কিছু না পেয়ে ঢাকা থেকে আসা চাপ সহ্য করার কোনো ইচ্ছা নেই দিল্লির। ভারতের কাছে ভবিষ্যতের জন্য এই বিষয়টি পরিষ্কার। কারণ, সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি ছাড়া সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, বাংলাদেশের দিক থেকে কৌশলগত নমনীয়তা তত কমবে, যার সুবিধা পাবে ভারত।
আপাতত কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়। রহমানের প্রেস সেক্রেটারি পিটিআই-কে জানিয়েছেন, ভারত সফরের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এছাড়া ঢাকা নয়াদিল্লির কাছ থেকে হাসিনাকে এবং ভারতে অবস্থানরত বলে ধারণা করা অন্যান্য ‘পলাতক অপরাধী’কে ফেরত পাঠানোর অনুরোধের বিষয়েও উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে রাষ্ট্রপতি ভবনের সেই ঘটনাটি। একটি ইমেইলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য ‘আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা’-র মহড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। রাজনৈতিক কারণে প্রক্রিয়াটি থামিয়ে দেওয়ার আগে প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছিল, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ফলে তারিক রহমানের সফরটি এখন পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন চাপের মুখে পড়েছে। ব্যবহারিক প্রয়োজনে সরকারের ভারতকে প্রয়োজন। অন্যদিকে বিরোধী শক্তিগুলো চায় কঠোর অবস্থান। হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখন সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষায় আরও পরিণত হয়েছে। এছাড়া নয়াদিল্লির ওপর বাংলাদেশ কতটা চাপ প্রয়োগ করতে পারে বা করা উচিত সে বিষয়ে প্রশাসনের ভেতরে পুরোপুরি ঐকমত্য আছে বলে মনে হয় না। আলোচনা হয়তো চলতে থাকবে। সফরটি হয়তো শেষ পর্যন্ত আবার শুরু হতে পারে। কিন্তু বড় প্রশ্নটি এখন আর কেবল তারিক রহমানের দিল্লি যাওয়া বা না-যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।