নয়াদিল্লি: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে তাঁর অপসারণ এবং এসআইআর বাতিলের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন তীব্র হচ্ছে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটের ডাকে রাজধানী দিল্লি-সহ বিভিন্ন শহরে লাগাতার বিক্ষোভ চলছে। এই পরিস্থিতিতে শনিবার থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে ধর্নায় বসার ঘোষণা করেছে ককরোচ জনতা পার্টির অভিজিৎ দীপক এবং আশুতোষ রাঙ্কারা।
এই টালমাটাল আবহেই জ্ঞানেশ কুমার এবং কেন্দ্রের পাশে দাঁড়ালেন দেশের ৪২ জন প্রাক্তন বিচারপতি। বৃহস্পতিবার একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করে তাঁরা বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের মতে, এই ধরনের লাগাতার বিক্ষোভ মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। এর নেপথ্যে দেশের ভেতরের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর পাশাপাশি বিদেশি শক্তিও সক্রিয় রয়েছে।
অন্যদিকে উত্তপ্ত এই পরিস্থিতে পথে নেমে প্রতিবাদ শুরু করেছে বিরোধী শক্তিগুলো। সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ভবনেও জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে চায় বিরোধীরা। গত সপ্তাহেই ইন্ডিয়া জোটের তরফে ঘোষণা করা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে যাওয়া হবে। সূত্রের দাবি, বিরোধী শিবিরের ১০ জন প্রতিনিধিকে শুক্রবার সাক্ষাতের সময় দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।
সূত্রের খবর, সেই কর্মসূচিতে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার দুপুরেই দিল্লি পৌঁছেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও শুক্রবার আদৌ রাইসিনা হিলসে বিরোধী নেতাদের প্রবেশের অনুমতি মিলবে কিনা, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গিয়েছে। তবে শনিবার যন্তর মন্তরে ইন্ডিয়া জোটের যে বড় সমাবেশ রয়েছে, তাতে মমতা থাকবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই খোলা চিঠিতে ৪২ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা লিখেছেন, এই অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে কিছু নৈরাজ্যবাদী এবং প্রান্তিক গোষ্ঠী, যারা দেশের ভিতরে এবং বাইরে থেকে অশান্তি ছড়াচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, এই মুহূর্তে চুপ থাকা মানে নিরপেক্ষ থাকা নয়। সাংবিধানিক সংস্থাগুলির উপর লাগাতার আক্রমণ হচ্ছে এবং তার মূল লক্ষ্য নির্বাচন কমিশন। এমনকি বিচারবিভাগকেও ছাড়া হচ্ছে না।
তবে প্রাক্তন বিচারপতিদের এই চিঠিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টে দাবি করা হয়, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সঁধু এবং বিবেক জোশী গত ১০ মাসে ১৪ বার কমিশনের সিদ্ধান্তে আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, তাঁদের না জানিয়ে ফর্ম-৬ এর ভাষা পরিবর্তন, এসআইআর প্রক্রিয়ার পর ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া ও যোগ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কমিশনের তরফে দাবি করা হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি নিয়েই ফর্ম-৬ এ বদল আনা হয়েছে, যদিও প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ সেই দাবি খারিজ করে দেয়। প্রাক্তন বিচারপতিরা তাঁদের চিঠিতে এই প্রসঙ্গগুলি উল্লেখ করেননি। বরং তাঁরা বলেছেন, এসআইআর হল একটি বৈধ প্রক্রিয়া যার উদ্দেশ্য নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা। পাশাপাশি প্রশ্ন তুলেছেন, কোনও প্রমাণ ছাড়া কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে এত বড় অভিযোগ আনা যায়! ফলে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে ক্রমশই জটিল হচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমতাবস্থায় আজ বিরোধীদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ কোনদিকে মোড় নেবে তা নিয়েও বাড়ছে জল্পনা।