তাপস মহাপাত্র
‘গ্লোবাল সাউথ’-কে শুধু ‘নিয়ম মেনে চলা পক্ষ’ থেকে বেরিয়ে এসে ‘নিয়ম-নির্ধারক’-এর ভূমিকা নিতে হবে, দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে এ কথাই জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একই সঙ্গে তিনি জোর দেন প্রতিটি সদস্য দেশের নিজস্ব কণ্ঠস্বর বা মত প্রকাশের গুরুত্বের ওপর।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী আরও বলেন, ব্রিকস দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে ভারত প্রস্তুত। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত গ্লোবাল সাউথকে ‘নিয়ম মেনে চলা পক্ষ’ থেকে ‘নিয়ম-নির্ধারক’-এ রূপান্তর করা। ব্রিকসের মাধ্যমে আমরা গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশগুলোর তরুণ কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনা বা দরকষাকষির দক্ষতা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং আইনি বিষয়ে পারদর্শী করে তুলতে পারি।”
রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের শি জিনপিং, ইরানের মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিল রামাফোসা, মালয়েশিয়ার আনোয়ার ইব্রাহিম এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রবোও সুবিয়ান্তোর উপস্থিতিতে মোদী স্পষ্টতই বলেন, গ্লোবাল সাউথ আন্তর্জাতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা নেই। তাঁর আক্ষেপ, “আজ গ্লোবাল সাউথ আন্তর্জাতিক সংকটের সম্মুখসারিতে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা রয়েছে পেছনের সারিতে। আমাদের এই ‘সুবিধার পিরামিড’কে ‘অংশীদারিত্বের মঞ্চে’ রূপান্তর করতে হবে—যেখানে প্রতিটি দেশের কণ্ঠস্বর থাকবে, প্রতিটি সদস্যের অংশগ্রহণ বা অংশীদারিত্ব থাকবে এবং প্রতিটি প্রচেষ্টার মূলে থাকবে মানবজাতির উন্নয়ন।”
প্রধানমন্ত্রী মোদী এই আঞ্চলিক জোটের পরবর্তী সম্মেলনের আগেই সংস্কারের একটি রূপরেখা তৈরির প্রস্তাবও দেন। যেখানে বলা হয়েছে- প্রতিনিধিত্ব, সংবেদনশীলতা এবং নিয়ম-নির্ধারণের মতো মূল স্তম্ভগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, “আমরা সম্মিলিতভাবে এই আঞ্চলিক ব্লকের শাসনব্যবস্থা সংস্কারের জন্য ১০টি প্রস্তাবনা তৈরি করি, যাতে পরবর্তী সম্মেলনের মধ্যে সেগুলোকে একটি ‘ব্রিকস সংস্কার রূপরেখা’-য় উন্নীত করা যায়। এই রূপরেখা তৈরির সময় আমাদের তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর মনোযোগ দিতে হবে: প্রতিনিধিত্ব, সংবেদনশীলতা এবং নিয়ম-নির্ধারণ।”
প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে মোদী বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কার আর বিলম্বিত করা যায় না। এছাড়া, খসড়া-ভিত্তিক আলোচনাকে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এবং স্পষ্ট ও বাস্তবিক ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একইভাবে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ভোটিং ক্ষমতা, নেতৃত্বের পদ এবং নীতিগত অগ্রাধিকারগুলোকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
নিরন্তর আলোচনার মাধ্যমে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিকস একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভারতে অনুষ্ঠিত এই আঞ্চলিক জোটটির এবার দুই দশক পূর্তি।
বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্ব ‘জন-কেন্দ্রিক’ ও ‘মানবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া’র দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা এবং শক্তিশালী উন্নয়ন—এগুলোই এই জোটের মূল অগ্রাধিকার। তাঁর কথায়, গত ২০ বছরে বিশ্বমঞ্চে ব্রিকস একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছে, যা এখন পরিপক্বতা ও দায়িত্বশীলতার এক নতুন অধ্যায়ের নির্দেশ করছে।
তিনি বলেন, এর অগ্রগতি হওয়া উচিত সদস্য দেশগুলো পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতেই, কারও বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ২০ বছরে এই জোটকে একটি নতুন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মসূচির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।