নিজস্ব সংবাদদাতা : যন্তর মন্তরের পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে কনাট প্লেসও। ককরোচ জনতা পার্টির ১৬ তারিখের কর্মসূচির আগেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন দিল্লি পুলিশ সুকৌশলে তাদের অবরুদ্ধের পথে গেল। বৃহস্পতিবার দিল্লি হাইকোর্টে পুলিশের তরফে সিজেপি-র কর্মসূচিকে নিষিদ্ধ করার আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্ট তাতে সায় দেয়নি। এবার ঘুরপথে তাদের অবস্থান বজায় রাখার পথে গেল দিল্লি পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় এবং ‘প্রশাসনিক কারণে’ ১৬ ও ১৭ অক্টোবর সেন্ট্রাল পার্ক জনসাধারণের জন্য বন্ধ রাখার বিজ্ঞপ্তি দিল নিউদিল্লি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন বা এনডিএমসি। এর প্রেক্ষিতে দিল্লি পুলিশ শুক্রবার কনট প্লেসে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র প্রস্তাবিত ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ মিছিলে অংশ না নেওয়ার জন্য জনগণের কাছে আহ্বান জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, কনট প্লেস ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। তবে তারা জানিয়েছে, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে উপযুক্ত স্থানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত গাওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
শুক্রবার সিজেপি ও আপ-এর ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচির উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভকারী ও সাধারণ জনগণের কাছে আবেদন জানাচ্ছে যে, তারা যেন এমন কোনো জমায়েতে অংশ না নেন, যা বর্তমানে কার্যকর বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে।”
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ নিয়ে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যেই, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে শুক্রবার কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে জাতীয় পতাকা হাতে ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ মিছিলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সিজেপি সোশ্যাল মিডিয়া ও সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে আবেদন জানায়, ১৬ অক্টোবর বিকেল ৫টায় যেন তারা তেরঙ্গা পতাকা নিয়ে সেন্ট্রাল পার্কে সমবেত হন।
এই পরিস্থিতিতে নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল দিল্লি পুলিশকে জানিয়েছে, ১৬ ও ১৭ অক্টোবর সেন্ট্রাল পার্ক বন্ধ থাকবে। তখন পার্কে বে-আইনি প্রবেশ ঠেকাতে যেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, কনট প্লেস ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ও বেআইনি জমায়েত থেকে সুরক্ষার অনুরোধ জানিয়েছে। কারণ, নবরাত্রি উৎসবের সময় তা ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এরপর বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারা লঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্ক করে পুলিশ জানিয়েছে, যারা এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে, শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে জনসাধারণের সহযোগিতা কামনা করেছে পুলিশ।
এছাড়া, জাতীয় পতাকা বহন ও প্রদর্শন এবং জাতীয় সংগীত গাওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম মেনে যথাযথ শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও শালীনতা বজায় রাখার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
ঘুরপথে ১৬ অক্টোবর ককরোচদের ডাকা প্রতিবাদ কর্মসূচি বানচাল করার কৌশল ভেস্তে দিল দিল্লি হাইকোর্ট। এমনিতেই ১০ অক্টোবর ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে যন্তর মন্তর কর্মসূচি ঘিরে পুলিশের অতি তৎপরতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এমন কি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করার দায়ে কৈফিয়ত দিতে হয়েছে কেন্দ্রকে। আদলতে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার কনট প্লেসের এক বিক্রেতার দায়ের করা আবেদনের শুনানি হয় দিল্লি হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নীতিন বাসুদেও সামব্রে এবং বিচারপতি সঞ্জয় শর্মার বেঞ্চে। আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিত আইন অনুযায়ী এই প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছিল। আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী আদালতে জানান, উৎসবের মরসুমে মধ্য দিল্লিতে প্রতিবাদ কর্মসূচির কারণে যদি আরও একটি সপ্তাহান্তে দোকানপাট বন্ধ থাকে, তবে ব্যবসার প্রভূত ক্ষতি হবে। পথে বসবেন তাঁরা। তখন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল চেতন শর্মা জানান, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেন, আবেদনকারীর উদ্বেগগুলো বিবেচনায় রাখা হবে। আদালত পুলিশের এই নিশ্চয়তাকে নথিবদ্ধ করেছে। যদিও আবেদনকারীর আইনজীবী সিজেপি-র কর্মসূচি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার জন্য একটি ‘সুনির্দিষ্ট’ নির্দেশ জারির অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, “জোর করবেন না। আমরা ইতিমধ্যে আদেশ দিয়ে দিয়েছি।”
বৃহস্পতিবার সকালে বিষয়টি আদালতে ওঠার সময় আবেদনকারীর আইনজীবী বলেছিলেন, “কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কের প্রাণকেন্দ্রে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে আমাদেরই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এটি প্রতিবাদের জন্য উপযুক্ত জায়গা নয়। তারা ইতিমধ্যেই দোকানপাট বন্ধ করতে শুরু করেছে। এখন দশেরার সপ্তাহান্ত চলছে। এই প্রতিবাদ কর্মসূচি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।” এর প্রেক্ষিতেই পুলিশ হাইকোর্টকে আশ্বস্ত করে যে সেদিন ককরোচের কর্মসূচি সামাল দিতে তারা ‘সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ’ গ্রহণ করবে। আদালতে পুলিশের এই আশ্বাস আদালত নথিভুক্ত করেছে।
এদিকে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে কেবল ‘ত্রিরঙা পতাকা ওড়ানোর অপরাধে’ কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাই ১৬ অক্টোবর সমস্ত দেশপ্রেমিককে জাতীয় পতাকা হাতে এই কর্মসূচিতে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর দাবি, সিজেপি সদস্য সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে ‘ত্রিরঙা পতাকা ওড়ানোর কারণেই’ জেলে পাঠানো হয়েছে। পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে তাঁদের রাখা হয়েছে তিহার জেলে। দীপকে বলেছেন, তাঁরা প্রমাণ করে দেবেন যে তেরঙা পতাকা ওড়ানো কোনো অপরাধ নয়। যাঁরা দিল্লিতে আসতে পারছেন না, তাঁদের নিজ নিজ শহরে ‘তেরঙা মিছিল’ আয়োজন করার আবেদন জানান দীপকে। এছাড়া, তিনিও কারাবন্দি হতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে তিনি এ নিয়ে বিচলিত নন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সাফ কথা, “তেরঙা পতাকা আমার গর্ব, আর আমি তা অবশ্যই উঁচিয়ে ধরব।”