অসীম সেন
সপ্তমীর সূচনা হয় নবপত্রিকা স্নানে। এখন অবশ্য এই স্নান যাত্রায় কচিকাচারা সামিল হয় না সেভাবে। সারারাত প্যান্ডাল হপিং করে তারা ক্লান্ত। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন পাড়ার সন্তু তোতাদের বোঝানো হয়েছিল নবপত্রিকা স্নান মানে যদিও কলাবউ স্নান, কিন্তু এই কলাবউ মোটেই গনেশ দাদার বউ নন। কলাবউ হলেন দুর্গারই এক রূপ। শাস্ত্রমতে মহা সপ্তমীতে দেবী দুর্গার সপ্তম রূপ অর্থাৎ কালরাত্রি রূপের পুজো করা হয়। দেবী কালরাত্রী হলেন অন্ধকার ও সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশকারিণী এবং শুভ শক্তির প্রতীক।
কালরাত্রীর গাত্রবর্ণ গাঢ় অন্ধকারের মত। তিনি সকল অজ্ঞতা দূর করেন। কালরাত্রীর বাহন গর্ধব। দেবীর চার হাতে রয়েছে তলোয়ার, লোহার কাঁঠা এবং বাকি দুই হাত দিয়ে অভয় দান করেন, বর প্রদান করেন। দেবীর তিন চোখ বিদ্যুতের ন্যায় দীপ্তময়। দেবী এলোকেশী। কাল অর্থ সময় এবং রাত্রি হল অন্ধকার। দেবী নেতিবাচক সব শক্তিকে বিনাশ করেন। ভক্তদের কাছে তিনিই আবার শুভঙ্করী।
সপ্তমীর সকালে দেবীর আরাধনয়ায় শস্যদেবী রূপে নয় উদ্ভিদের পুজো করা হলেও মূল প্রতিমার ক্ষেত্রে চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে কালরাত্রি রূপের আবাহন করা হয়। কালরাত্রির উপাসনায় শনি দেবের কুপ্রভাব দূর হয় বলে মনে করা হয়। এই তিথিতে দেবীর আয়নায় বিভিন্ন পবিত্র উপাদান যেমন গঙ্গাজল, বৃষ্টির জল, ডাবের জল, চন্দন এবং নানা রকমের মাটি দিয়ে দেবীর মহাস্নান সম্পন্ন করা হয়। মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যদিয়ে দেবীর দিব্য চেতনাকে আবাহন করা হয়।
এই নবপত্রিকা স্নানে নয়টি উদ্ভিদকে একত্রিত করা হয়। যা দেবীর ৯ টি শক্তির প্রতীক। রম্ভা অর্থাৎ কলা গাছে দেবী ব্রহ্মাণীর স্মরণ করা হয় দেবী সৃষ্টির প্রতীক। কচুগাছ অর্থ কালিকা অশুভ বিনাশের প্রতীক, হরিদ্রা দেবী দুর্গা বিঘ্ন নাশিনী, জয়ন্তী দেবী কার্তিকী, বিল্ব দেবী শিবা, দাড়িম্ব দেবী রক্তদন্তিকা, অশোক দেবী শোকরহিতা, মানকচু দেবী চামুন্ডা এবং ধান গাছ দেবী লক্ষ্মীর প্রতীক।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে রাবণ বধের জন্য শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেছিলেন। মহাসপ্তমীতে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতির শুরু করেছিলেন এবং দেবীর আশীর্বাদ লাভ করেছিলেন। নবপত্রিকার পুরাণ চিন্তা বাদ দিলেও এই পুজোর মূল উৎস হল গ্রামীণ কৃষি সমাজের শস্যদেবীর আরাধনা। মানুষ যখন মূর্তিপুজো শুরু করেনি, তখন গাছপালা ও ফসলকে রক্ষা করার জন্য প্রকৃতির উপাদানের মাধ্যমেই শক্তির আরাধনা করত। নবপত্রিকা স্নান তারই প্রতীক। শারদীয় দুর্গাপুজোর মহা সপ্তমী পুজো গুরুত্বপূর্ণ এ কারণেই এই দিন থেকেই মহাপুজোর এবং মূল শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠান শুরু হয় এবং উৎসবের মূল পর্বের সূচনা ঘটে।