তাপস মহাপাত্র
বাংলার হাওয়ায় কান পাতলে একটা অর্থপূর্ণ কথা কানে আসে, তা হল- বাংলার মানুষ তৃণমূলকে হারিয়েছে। অর্থাৎ তৃণমূল হেরেছে বলেই বিজেপি জিতেছে। ২০১১ সালে এরকমই শোনা গিয়েছিল। ৩৪ বছর পর অতিষ্ট বাঙালিরা হারিয়েছিল বামফ্রন্টকে। তৃণমূল তাহলে বামফ্রন্টকে হারানোর জন্য ক্ষমতায় এসেছিল ! অর্থাৎ দেড় দশক ধরে বাংলার মাটিতে এমন কোনো রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি হল না যাকে জেতানোর জন্য মানুষ ভোট দেবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে যেন জনমতের চরিত্র কী বদলে গেল ?
এটা বুঝতে গেলে মণি শঙ্কর আইয়ারের একটা কথা খুবই প্রাসঙ্গিক মনে হয়। ১৯৯৭ সালে মণি শঙ্কর আইয়ার অল্প সময়ের জন্য তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। চলে যাওয়ার সময় তিনি এমন একটি মন্তব্য করেছিলেন যা এইসময়ের রাষ্টবিজ্ঞানের গবেষকদের কাছে খুবই মূলব্যান হতে পারে। তিনি বলেছিলেন, “আমি বুঝতে পারিনি যে তৃণমূল আসলে বাংলার চতুর্থ ফুটবল ক্লাব—মোহনবাগান, মহামেডান স্পোর্টিং এবং ইস্ট বেঙ্গলের পরেই যার স্থান।” বর্তমান পরিস্থিতিতে মণি শইঙ্করের ওই কথা কী শুধুই কৌতুকপূর্ণ মনে হচ্ছে ? অল্পদিনে, আজ থেকে ২৮ বছর আগে তিনি তৃণমূল সম্পর্কে কী গভীর বিশ্লেষণ করেছিলেন, তা নিশ্চয়ই দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার।
দেশের অন্যান্য জাতীয় দলগুলির ছাঁচে তৃণমূল যে প্রথাগত রাজনৈতিক আদর্শ, ধারণা কিংবা শৃঙ্খলায় গড়ে ওঠেনি তা ভোটের ফলাফলের অল্পদিনের মধ্যেই স্পষ্ট। রাজনীতির ময়দানে জয় পরাজয় হতেই থাকে। তাই বলে এভাবে তাসের ঘরের মতো কার্যত রাতারাতি ভেঙে পড়েনি অন্যান্য দলগুলি। আসলে তৃণমূল কোনো প্রথাগত সংগঠন হয়ে ওঠার আগেই এটি ছিল এক আবেগ। আবেগসর্বস্বতা দিয়ে একটি জনগোষ্ঠি ১৫ বছর কী করে রাজত্ব করে গেল সেটাই এখন গবেষণার বিষয়। এই দলের কর্মীরা শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থকই ছিলেন না, তাঁরা তাঁর চারপাশের এক বিশেষ আবহে ডুবে থাকতেন। যেখানে ছিল আহত অভিমান, বিদ্রোহের সুর, বাম-বিরোধী ক্ষোভ, রাজপথে লড়াইয়ের সাহস, সাংস্কৃতিক একাত্মবোধ এবং ফুটবলের প্রতি অনুরাগের মতোই এক অন্ধ আনুগত্য, যেখানে যুক্তির চেয়ে দলের ‘রঙ’ বা পরিচয়ের গুরুত্বই ছিল বেশি। আর একে ভর দিয়েই বহু বছর ধরে তৃণমূলের অভাবনীয় সাফল্য। মমতা মানুষের অস্থিরতাকে বিদ্রোহে, বিদ্রোহকে জনমতের রায় এবং সেই রায়কে নিরঙ্কুশ আধিপত্যে রূপান্তরিত করেছিলেন। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি দল এভাবেই ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে টানা তিনটি মেয়াদ বাংলাকে শাসন করে গেল। শাসন করল কাণায় কাণায় শক্তি দিয়ে। যার পুরোটাই বলতে গেলে স্বর্ণযুগ। আর পতন বলতে কার্যত অস্তিত্ত্বহীনতা। রাজনীতিতে বোধ হয় এর কোনো তুলনামূলক নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ঠিক এই কারণেই দলটির এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন শুধুমাত্র পরাজয় বা ভোট পরবর্তী কোনো সাধারণ সংকট হিসেবে দেখলে ঠিক হবে না। রাজনৈতিক দল নির্বাচনে হারে—এটাই রাজনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। ১৯৭৭ সালে ক্ষমতা হারানোর পরেও কংগ্রেস ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৪ সালে হেরে গিয়েও বিজেপি নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলেছিল। তিন দশক পর বাংলায় ক্ষমতা হারানোর পরেও বামপন্থীদের মধ্যে কর্মীদের স্মৃতি, আদর্শগত অভ্যাস এবং সাংগঠনিক কাঠামোর রেশ আজও টিকে আছে। কিন্তু তৃণমূলের ক্ষেত্রে যা ঘটছে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি কেবল পরাজয়ের বিষয় নয়। এটা ভিতহীন ইমারতের আকস্মিক ধুলিসাৎ। তার কারণ, ২০২৬ সালের ভোটে নির্মম জনাদেশ। যা ভবানীপুরকেও ছাড়েনি।
তৃণমূলের মূল ট্র্যাজেডি বা বিড়ম্বনা হল, দলটি ক্ষমতার রাজনীতিতে অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠলেও প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলায় ততটা পারদর্শী হয়ে ওঠেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে প্রতিকূলতার সঙ্গে পরিচিত; তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবনই গড়ে উঠেছে সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বামফ্রন্ট যখন অপরাজেয় বলে মনে হত, তখনই তিনি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তাঁকে শারীরিক আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে, উপহাস ও অবজ্ঞার পাত্র হতে হয়েছে, একঘরে করে রাখা হয়েছে এবং বারবারই তাঁকে খাটো করে দেখা হয়েছে। তাঁর উত্থান ছিল কংগ্রেস-পরবর্তী ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সাধারণ পটভূমি থেকে উঠে আসা এক নারী বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিকে পরাজিত করেছিলেন।
কিন্তু তাঁকে কেন্দ্র করে যে দলটি গড়ে উঠেছিল, তারা সবসময় সেই সাহসিকতা বা লড়াইয়ের মানসিকতা উত্তরাধিকার সূত্রে পায়নি। অনেকেই কেবল ক্ষমতার অভ্যাসগুলোই আয়ত্ত করেছিল। যেমন—স্থানীয় আধিপত্য, ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশাধিকার, চাপ সৃষ্টি, দলবদল, পৃষ্ঠপোষকতা, ক্লাব, পৌরসভা, ইউনিয়ন, থানা, সরকারি সুবিধাভোগীর তালিকা, ঠিকাদারি ও স্থানীয় সিন্ডিকেট নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে তৈরি হয়েছিল একদল ‘ম্যানেজার’ বা ব্যবস্থাপক—যাঁরা দলের আদর্শে বিশ্বাসী কর্মী নন, বরং ক্ষমতার কারবারি। মমতা এবং তাঁর দলের বড় অংশের মধ্যে পার্থক্যটা এখানেই। বিরোধী দলে থেকে কীভাবে লড়াই করতে হয়, তা তিনি জানতেন। কিন্তু তৃণমূলের অধিকাংশ নেতাই শুধুমাত্র সরকারের ছত্রছায়ায় থাকতে জানতেন। রাজনীতির এই ধরনটি—ক্ষমতায় থাকাকালীন দাপট আর পরাজয়ের মুখে ভীতি—অস্বাভাবিক রকমের প্রকট হয়ে ওঠে। এমন নয় যে ভারতে শুধুমাত্র তৃণমূলের রাজনীতিবিদরাই সুবিধাবাদী। তবে এই বৈপরীত্যের মাত্রাটি অত্যন্ত চোখে পড়ার মতো মনে হয়েছে। তাই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী শিবিরের ক্ষোভকে বুঝতে হবে এরই প্রেক্ষাপটে। আঞ্চলিক দলগুলোতে উত্তরাধিকারের বিষয়টি খুব কম ক্ষেত্রেই আদর্শগত হয়। বরং সেখানে অধিকারবোধ, ক্ষমতার নাগাল পাওয়া এবং পুঞ্জীভূত ক্ষোভই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা যখন ছিল, তখন তৃণমূলের অনেক নেতাই অভিষেকের উত্থান মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরাজয় আসতেই সেই উত্থানই অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়াল। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, তাঁর বিরুদ্ধে করা প্রতিটি সমালোচনা ভিত্তিহীন। এর মানে হল, পরাজয়ের ফলে ব্যক্তিগত বিরক্তি এখন প্রকাশ্যে চলে এল।
এখন সুসময়ের আশায় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে নিসন্দেহে কোনো সহজ উপায় নেই। যদি তিনি দলের কাঠামো ধরে রাখতে আইনি ও পদ্ধতিগত লড়াই চালাতে যান তাহলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে। যথাসম্ভব সাংসদকে নিজের পক্ষে ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারেন। এতে হয়তো কিছুটা সময় পাওয়া যাবে, কিন্তু শুধু এর মাধ্যমে দলের ওপর তাঁর বৈধতা বা গ্রহণযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা আর বোধ হয় সম্ভব নয়।
তাঁর সামনে আরেকটি পথ-বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা। এমনকি তার জন্য যদি অভিষেকের ক্ষমতা কিছুটা কমাতে হয় এবং বৃহত্তর যৌথ নেতৃত্ব মেনে নিতে হয়, তবুও। এটি বেদনাদায়ক হতে পারে, কিন্তু রাজনীতিতে অনেক সময় অহংকারের চেয়ে টিকে থাকাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তৃতীয়ত উপায় হল- একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে সংগঠন পুনর্গঠন করতে পারেন—পুরসভা, পঞ্চায়েত, নারী সংগঠন, সংখ্যালঘু ভোটার, সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং তাঁদের নিয়ে, যাঁরা এখনও তাঁকে বাংলায় বিজেপি-বিরোধী একমাত্র প্রকৃত মুখ বলে মনে করেন। এটিই সবচেয়ে কঠিন পথ, কিন্তু সম্ভবত একমাত্র এই পথেই তাঁর নৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

শেষ উপায় হল, কংগ্রেস ও বামেদের সঙ্গে নিয়ে একটি বৃহত্তর বিজেপি-বিরোধী জোট বা ‘মহাজোট’ গঠনের চেষ্টা করতে পারেন—যা হবে পরিস্থিতির প্রয়োজনে গঠিত এক জোট। কিন্তু এখানেই রয়েছে আসল জটিলতা। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যে কংগ্রেসের তরফে মমতাকে যোগদানের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে শোনা গেলেও, প্রশ্ন হল, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি মমতাকে ‘গ্রহণ’ করে, তাহলে প্রদেশ নেতৃত্ব কি আদৌ সেই সিদ্ধান্ত মানবে ? এও শোনা যাচ্ছে মমতা কংগ্রেসে এলে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী মুখ হিসেবে রাহুল গান্ধীকেই মানতে হবে, এমন শর্ত দিয়েছ কংগ্রেসের একাংশ। কারণ, কোনো শর্ত ছাড়াই মমতাকে রক্ষা করার মতো বিশেষ কোনো তাগিদ তাদের নেই। বছরের পর বছর ধরে তৃণমূলের শাসনকালে বাংলার কংগ্রেস কর্মীরা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বামেদের বৈরিতা তো আরও গভীর। জাতীয় স্তরে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আওতায় হয়তো সব বিজেপি-বিরোধী শক্তিকে কংগ্রেসের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বাংলায় তাৎক্ষণিক কোনো মহাজোট গঠিত হলে কংগ্রেসকে হয়তো এমন এক দলের ভূমিকা নিতে হবে যাতে এটা মনে হতে পারে যে বিপর্যস্ত তৃণমূলকে সাময়িক সহায়তা দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করছে তারা। কারণ, ‘মহাজোট’ বা বৃহত্তর জোটের জন্য সমতার প্রয়োজন হয়। বাংলায় অনেক নেতার ভিড়ে কেবল ‘অন্যতম একজন’ হয়ে থাকাটা মমতা কখনোই পছন্দ করেন না। অন্তত তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট থেকে এটা মনে করা ভুল হবে না।, তবু তাঁর দলের এই প্রবল ভাঙনে যদি তাঁর আত্ম-ধারণা বদলায়, হয়তো অন্য মমতাকে পাওয়া যাবে ! সেই উপসংহারের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।