অর্ণব দত্ত
কেন্দ্রীয় কয়লামন্ত্রী জি কিষাণ রেড্ডি একটি জরুরি খবর শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক কয়লা মজুত আছে।“
এদিকে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। কারণ কেন্দ্রীয় ইলেকট্রিসিটি অথরিটির দেওয়া তথ্য অনুসারে, সারা দেশে ১৯১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৮৪টি কেন্দ্রেই বিদ্যুতের উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
২০২৬ সালে ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা গত এক দশকের নিরিখে ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছরে উৎসবের মরসুমের আগে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে, চলতি বছরে সারা দেশে বিদ্যুতের যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে, তা ২০২৩ সালের নিরিখে সর্বোচ্চ বলে সূত্রের খবর।
এদিকে আরেক গুরুতর সমস্যা হল, চলতি বছরের বর্ষার মরসুমে গত জুন মাসে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি সর্বাধিক। ২০১৪ সালের পর এই প্রথম এধরনের পরিস্থিতির শিকার ভারত। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি নামে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পেশ করা তথ্য অনুসারে, সারা বিশ্বব্যাপী বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে শুরু করার ফলে এরপর অভূতপূর্ব কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে গোটা দুনিয়াকেই। অদূরভবিষ্যতে বিশ্ব নাগরিকদের হতে হবে গলদঘর্ম।
আবহাওয়া দফতরের পেশ করা তথ্য অনুসারে, ১৯০১ সালের পরে ২০২৬ সালের অগাস্টে অর্থাৎ ১২৫ বছরের সময়ের ব্যবধানে রেকর্ড দাবদাহ সহ্য করতে হয়েছে ভারতীয় নাগরিকদের। এবাদে স্বাভাবিক তাপমাত্রার তুলনায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির জাতীয় গড় শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, কয়লার ভাণ্ডারে টান লেগেছে। কেন্দ্রীয় কয়লামন্ত্রী জি কিষাণ রেড্ডি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করলেও কেন্দ্রীয় সরকার এদিকে আরেকটি পৃথক বিবৃতি দিয়ে সতর্ক করেছে, “বিদ্যুতের জোগান কমতে শুরু করায় ২০২৭ সালের গ্রীষ্মে ভালোরকম ভোগান্তি সইতে হবে দেশের নাগরিকদের। ২০২৩ সালে্র পরে ভারতে বিদ্যুতের জোগানের ক্ষেত্রে ঘাটতি চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের হিসেবে ৫৬০ মিলিয়ন কিলোওয়াট।“
সূত্রের খবর, ভারতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ তৈরি হয়, এর মধ্যে ৭০ শতাংশ কয়লা ব্যবহার করে উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে, ভারতে জলবিদ্যুতের উৎপাদনও ২০ শতাংশ কমেছে।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এর কারণ এল নিনোজনিত। এর ফলে প্রকৃতিতে যে অস্বাভাবিকতা দেখা দিচ্ছে, এর জেরে যথোপযুক্ত পরিমাণ বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। কোন পথে সমস্যা মোকাবিলা করা যাবে, তাও অসীম দুশ্চিন্তার কথা।
সরকারি সূত্রের খবর, মজুত কয়লার পরিমাণ ক্রমে কমছে। শূন্য দশমিক ২৪৩ মেট্রিক টন থেকে হ্রাস পেয়ে চলতি মাসে তা অর্ধেকের চেয়েও কমে এসে ঠেকেছে। সরকারি রিপোর্ট অনুসারেই কেন্দ্রীয় কয়লামন্ত্রীর কথায় ভরসা করা যাচ্ছে না, একথা বলাবাহুল্য।
বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের উচ্চবিত্ত নাগরিকদের একাংশ বিশেষত গ্রীষ্মে লাগামহীনভাবে এসি মেশিন ব্যবহার করছেন। এর মাসুল গুনতে জেরবার হতে হচ্ছে এবং হবে অসংখ্য নাগরিককে।
সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসি়টি অথরিটি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রকে সুপারিশ করেছে জাতীয় বিদ্যুৎ নীতি প্রণয়ন করার জন্যে। সর্বশেষ হিসেব অনুসারে, কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড তথা সিআইএলের অধীনে ৩১৩টি কয়লাখনি চালু আছে। এর মধ্যে ওপেন কাস্ট খনি ১৬৮টি, ভূগর্ভস্থ খনি ১৩১টি, এবাদে আরও ১৪টি খনি কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড পরিচালিত।
দেশের যে রাজ্যগুলিতে কয়লাখনিগুলি রয়েছে, সেই রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম রাজ্য ওড়িশা, ছত্তীশগড়, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ। এবাদে দেশের উত্তরৃ-পূর্বের রাজ্য অসম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ এবং নাগাল্যান্ডেও কয়লাখনিগুলি অবস্থিত।
সবচেয়ে বেশি কয়লাখনি রয়েছে ঝাড়খণ্ডে। সূত্রের খবর, এখানে মোট ১১৩টি কয়লাখনি রয়েছে। সারা দেশে মোট যত সংখ্যক কয়লাখনি রয়েছে, তার মধ্যে ২৬ শতাংশই এই রাজ্যে অবস্থিত।
সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যম সূত্রের খবর, ভারতে বর্তমানে কয়লাখনিগুলিতে কাজ করছেন অন্তত ৫ লক্ষ নাগরিক। ২০২৬ সালের হিসেব অনুসারে, এর ভিতর কেবল কোল ইন্ডিয়াতে কাজ করছেন দুই লক্ষাধিক নাগরিক। কয়লাখনিগুলিতে কর্মরতদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সংখ্যক তফশিলি জাতি, আদিবাসী এবং অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়ের অন্তর্গত বলে সমীক্ষা মারফত জানা গিয়েছে।