কস্তুরী সেনগুপ্ত
প্রাচীনকালে ভারতবর্ষে যে নারী ও পুরুষ উভয়েরই শিক্ষাগ্রহনের সমান সুযোগ ছিল, তা আমরা জানি। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, সেই সময়ে নারী-পুরুষের পাঠ্যক্রম কি একই ছিল? নাকি এই বিষয়ে পুরুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো? সত্য হলো, শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান সুযোগ, সমান পাঠ্যক্রমের অধিকার পেতেন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, নারীরা বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ সবই পড়তেন। মুন্ডক উপনিষদে যে সকল বেদাঙ্গের উল্লেখ আছে — শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দঃ এবং জ্যোতিষ– এসবই পড়ার অধিকারিনী ছিলেন নারীরা।
চার বেদ এবং বেদাঙ্গ হল অপরা বিদ্যা যাকে বলা যায় নিম্নস্তরের বৈষয়িক জ্ঞান। আর অক্ষর জ্ঞানকে বলা হয় পরা বিদ্যা বা শ্রেষ্ঠতম বিদ্যা। নারীরা এই পরা ও অপরা এই দুই বিদ্যার সবকিছুই আয়ত্ব করেছিলেন। যার ফলে তাঁরা খ্যাতনাম্নী পন্ডিতা, মন্ত্রদ্রষ্ট্রী এবং উপাধ্যায়া পদে উন্নীত হতে পেরেছিলেন।
বৈদিক নারী ঋষিদের দ্বারা দৃষ্ট বা রচিত মন্ত্রগুলো থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় যে, তাঁদের শিক্ষার মান খুব উঁচদরের ছিল। শুধু তাই নয়, তাঁরা অত্যন্ত পারদর্শিনী ছিলেন রচনাশৈলীতে। এই রচনাগুলির মধ্যে পরিস্ফুট হয়েছে তাঁদের গভীর অনুভূতির স্পর্শ, অসাধারণ প্রকাশভঙ্গি এবং রচনাশৈলীর সতেজতা এবং আবেগময়তা।
কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত, এবং নৃত্য এই ধরনের চারুকলাবিষয়ক শিক্ষা দেওয়া হতো সেকালের নারীদের। সংগীত নিবেদন করতেন তাঁরা বিভিন্ন বৈদিক অনুষ্ঠানগুলোতে। বিশেষ কোনো উৎসব অনুষ্ঠানে নারীরা যে সংগীত নিবেদন করতেন তার উল্লেখ আছে ঋগ্বেদে। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র যে বাজাতেন নারীরা সেই তথ্যও পাওয়া যায় মহাভারতে। নারীদের নৃত্য পারদর্শিতার বহু উল্লেখ আছে ঋগ্বেদে। তাঁদের অসাধারণ বাগ্মিতা মুগ্ধ করতো প্রকাশ্য জনসভায়, পন্ডিত সংসদে।
সেইযুগে নারীদের সামরিক শিক্ষালাভের দৃষ্টান্ত আমরা পাই ঋগ্বেদে। নারী ঋষি ঘোষার দৃষ্ট মন্ত্রে বধ্রিমতী ও বিষ্পলা নামে এই দুই নারী যোদ্ধার উল্লেখ আছে। সেই যুগে সেনাবাহিনীতে নারীদের সৈন্যরূপে নিয়োগ করা হতো। যুদ্ধে নারীকে হত্যা করাও অন্যায় বলে মনে করা হতো না।
খ্রীস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে বাৎসায়নের কামসূত্রে ৬৪টি কলার উল্লেখ আছে। এই সকল কলাবিদ্যার মধ্যে সংগীত , নৃত্য, ক্রীড়া, চিত্রবিদ্যা, মাল্যরচনা, সীবন বিদ্যা, কাব্য রচনা, বৃক্ষ পালন, তক্ষণ বিদ্যা, শরীর গঠন বিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষনীয় ছিল নারীদের। কাজেই বলা যেতে পারে, সেইযুগে নারীদের বিভিন্ন ধরনের বিদ্যায় শিক্ষিত করে তোলার ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকত না।