রজত ভট্টাচার্য
ভারতীয় সংগীতমঞ্চে যাঁর নাম উচ্চারিত হলে মনে পড়ে যায় সোনালি যুগের সেই অদ্ভুত মায়াবী প্লেব্যাক—তিনি উদিত নারায়ণ। ১ ডিসেম্বর তাঁর জন্মদিন। বহু গানের মাঝে যে উজ্জ্বল চিহ্ন রেখে গেছেন তিনি, তা শুধু বলিউড নয়, গোটা ভারতীয় সংগীতেরই এক বিশাল উত্তরাধিকার। তাঁর জন্মদিনে যখন নানান জায়গায় স্মরণ, শ্রদ্ধা আর নস্টালজিয়ার ঢল নেমেছে, তখন তাঁর জীবনযাত্রার কিছু অজানা, অকপট সত্যও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন শিল্পী কখনোই শুধু সুরে বানানো নয়; তিনি রক্তমাংসের মানুষ, আলো-অন্ধকার মিলেই তাঁর পথচলা।
নেপালের সাপতরী জেলার একটি সাধারণ পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। সেই ছোটবেলার নিষ্পাপ স্বপ্ন—রেডিওয় বাজা গান, গ্রামের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সবই তাঁকে টেনে নিয়ে যায় সুরের দিকে। খুব অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিলেন তাঁর কণ্ঠই তাঁর মূল শক্তি। ভারতের পাটনা রেডিওতে প্রথমবার সুযোগ পাওয়ার পর শুরু হয় তাঁর লড়াই। কিন্তু বড় স্বপ্ন পূরণ করতে গেলে বড় শহরের দরকার—সেই পথেই তিনি চলে আসেন মুম্বাইতে। প্রথম দিকে রেকর্ডিং স্টুডিওর বাইরে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা, ক্ষুদ্র সুযোগের জন্য অপেক্ষা করা—এসবই ছিল তাঁর জীবনের নিয়ম। কেউ কেউ তাকে “ছোট দেশের ছেলে” বলে অবহেলা করতেন। কিন্তু যে কণ্ঠ শুধু সুর নয়, হৃদয়ের ভাষা বলতে জানে—তাকে কেউ থামাতে পারেনি।

এই দীর্ঘ সংগ্রামের প্রায় দশ বছরের মাথায় আসে ভাগ্যের দরজা। ‘কেয়া হুয়া তেরা ওয়াদা’ বা ‘পাপা কহতে হ্যায়’ আমরা সবাই শুনেছি। কিন্তু তাঁর ব্রেকথ্রু আসে ১৯৮৮ সালে, ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবির মাধ্যমে। আমির খান ও জুহি চাঁওলার তারুণ্যের প্রেমে যে আবেগ ডানা মেলেছিল, তাকে বাস্তবের অনুভূতিতে বেঁধে দিয়েছিল উদিতের কণ্ঠ—‘পাপা কহতে হ্যায়’, ‘আয়ে মেরে হমসফর’, ‘গজব কা হ্যায় দিন’। যে মানুষ গান শুনলে মনে হয়, প্রেম যেন প্রথম দিনের মতো আবার জন্ম নিচ্ছে—উদিত নারায়ণ সেই অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারতেন অনায়াসে।
সংগীতজগতে তাঁকে বলা হয় ‘স্মাইলিং ভয়েস অব ইন্ডিয়া’। কারণ তাঁর প্রতিটি গানে হাসির আলো, মায়ার রেশ। কখনো উচ্ছ্বাস—‘তিপ তিপ বরসা পানি’, কখনো কোমল প্রেম—‘পেহেলা নশা’, কখনো ব্যথা—‘কভি খুঁশি কভি গম’। তাঁর গলায় যেন এক অদ্ভুত তরুণ আবেগ—যা সময়কে বারবার ফিরিয়ে দেয় সেই ৯০-এর দশকে।
তবে একজন শিল্পীর জীবন যেমন আলোতে ভরা, তেমনি ভরপুর প্রশ্ন, বিতর্ক, ভুল বোঝাবুঝি। উদিত নারায়ণের জীবনেও তেমন একটি অধ্যায় রয়েছে, যা নিয়ে বহু বছর সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে।
২০০৬ সালে রঞ্জনা ঝা নামে একন মহিলা দাবি করেন যে তিনিই উদিতের প্রথম স্ত্রী। বিষয়টি দ্রুত শিরোনাম হয়। উদিত প্রথমে কথা বলতে চাননি; পরে স্বীকার করেন যে তাঁরা অতীতে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তাঁদের সম্পর্ক বহু আগেই ভেঙে গিয়েছিল—যখন তিনি এক সাধারণ সংগ্রামী যুবক, আর জীবনের পথ দুইদিকে গিয়েছিল। এই অধ্যায়টি তাঁর জীবনের চরিত্রকে নোংরা করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল অনেক সময়ই, কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো—মানুষ ভুল করে, আবার ভুলের সঙ্গে বাঁচতেও শেখে। উদিত নারায়ণ কখনো উত্তেজিত হননি, কখনো পাল্টা কাদা ছোড়েননি। তিনি খুব শান্তভাবে বলেন—“I have no bitterness. Life moves on.” এই বাক্যই বোঝায় তাঁর মানুষটিকে—ধীরে, সংযত, নিজের কাজে বিশ্বাসী।
আরেকদিকে তাঁর স্ত্রী দীপা নারায়ণ—যিনি নিজের পরিচয় সংগীতশিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছেন—সবসময় তাঁর পাশে থেকেছেন। তাদের দাম্পত্য-জীবনের দৃঢ়তা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা আজও বলিউডের কাছে এক উদাহরণ।
উদিত নারায়ণ শুধু গান গাইতেন না—গানের চরিত্র বুঝতেন। তাই রাজেশ রোশন, নাদিম-শ্রবণ, আনু মালিক, এ.আর. রহমান, সব প্রজন্মের সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে তাঁর কাজ সমান সফল হয়েছে। তাঁর কণ্ঠে নায়কের বয়স কখনো বাড়েনি—তিনি সর্বদাই তরুণ, সর্বদাই প্রেমে ডুবতে প্রস্তুত। তাঁর গলায় নিষ্পাপ একটি শিশুর আশ্চর্য স্বচ্ছতা আর পরিণত পুরুষের কোমল দায়িত্ব—দুটোই একসঙ্গে আছে।

আজ তাঁর জন্মদিনে যখন আমরা তাঁর অজস্র অমর গানের স্মৃতি মনে করি, তখন এটা বলতেই হয়—বলিউডে অনেক তারকা এসেছেন, অনেক গিয়েছেন; কিন্তু ৯০-এর দশকের যে “গোল্ডেন ভয়েস ট্রায়ো”—কুমার শানু, উদিত নারায়ণ, কেকে—তাদের উচ্চতা অন্য কেউ ছুঁতে পারেনি। উদিত নারায়ণ এই ত্রয়ীর সবচেয়ে মিষ্টি, সবচেয়ে কোমল সুর।
তাঁর ক্যারিয়ারে চারটি জাতীয় পুরস্কার, অসংখ্য ফিল্মফেয়ার, পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ—সবই এসেছে। কিন্তু এই পুরস্কারগুলি তাঁর সুরের তুলনায় ক্ষুদ্র। কারণ শিল্পীকে শেষ পর্যন্ত স্মরণ করা হয় কেবল এক জিনিসে—মন ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তে। আর উদিত নারায়ণ সেই মুহূর্ত শত শতবার দিয়েছেন।
শেষ কথা—একজন মানুষ, একজন শিল্পী, এক সাধনার নাম উদিত নারায়ণ। তাঁর জীবনে ছিল সাফল্য, ছিল সম্পর্কের জটিলতা, ছিল সংগ্রাম—কিন্তু সবশেষে তিনি ছিলেন এক বিশুদ্ধ কণ্ঠযোদ্ধা। তাঁর গলা শুনলেই আমরা আজও ফিরতে পারি আমাদের তারুণ্যের সেই দিনগুলোয়, প্রেমের প্রথম স্পর্শে, প্রথম অপেক্ষায়, প্রথম বৃষ্টিতে।
