চোখের রং বদলে ফেললেই যেন বদলে যায় চেহারার আকর্ষণ! কখনও নীল, কখনও ধূসর, আবার কখনও সবুজ বা হালকা বাদামি—পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে চোখের রং পরিবর্তন করার প্রবণতা এখন যথেষ্ট জনপ্রিয়। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ফ্যাশনের অঙ্গ হিসেবে কালার কন্ট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারের চল ক্রমশ বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে ছবি তোলা, পার্টি, বিয়েবাড়ি কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানে নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন রঙিন লেন্স। কিন্তু সৌন্দর্য বাড়ানোর এই প্রচেষ্টায় অজান্তেই চোখের বড়সড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে না তো? বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নিয়ম না মেনে কালার লেন্স ব্যবহার করলে চোখে সংক্রমণ থেকে শুরু করে দৃষ্টিশক্তির গুরুতর সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ফ্যাশনের আড়ালে বিপদের আশঙ্কা
কালার কন্ট্যাক্ট লেন্স মূলত চোখের স্বাভাবিক রং পরিবর্তন করার জন্য তৈরি করা হয়। কিছু লেন্স শুধুমাত্র সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে ব্যবহৃত হয়, আবার কিছু লেন্স দৃষ্টিশক্তি সংশোধনের পাশাপাশি চোখের রংও পরিবর্তন করে। সমস্যা হল, অনেকেই মনে করেন এই ধরনের লেন্স সাধারণ প্রসাধনীর মতোই নিরাপদ। ফলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অনলাইন, প্রসাধনীর দোকান কিংবা বিভিন্ন অস্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র থেকে লেন্স কিনে ব্যবহার করেন।
চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, চোখ অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ। কন্ট্যাক্ট লেন্স সরাসরি চোখের কর্নিয়ার উপর বসে থাকে। লেন্সের মাপ ঠিক না হলে, উপযুক্ত উপাদানে তৈরি না হলে কিংবা অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ব্যবহার করলে চোখের স্বাভাবিক সুরক্ষা ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে চোখের জন্য উপযুক্ত নয় এমন লেন্স ব্যবহার করলে কর্নিয়ায় আঁচড় লাগা, প্রদাহ এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
কী কী সমস্যা হতে পারে?
১. চোখে সংক্রমণ: অপরিষ্কার হাতে লেন্স পরা, লেন্স ঠিকমতো পরিষ্কার না করা কিংবা পুরোনো সলিউশন ব্যবহার করার ফলে চোখে জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে। এর ফলে চোখ লাল হওয়া, ব্যথা, জল পড়া এবং আলো সহ্য করতে অসুবিধা দেখা দিতে পারে।
২. কর্নিয়ায় ক্ষত: ভুল মাপের বা নিম্নমানের লেন্স কর্নিয়ায় ঘর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে। এতে কর্নিয়ায় ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
৩. দীর্ঘক্ষণ লেন্স পরে থাকলে চোখে অস্বস্তি, লালভাব ও ঝাপসা দেখার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৪. অ্যালার্জি ও শুষ্কতা: কিছু ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে লেন্স বা লেন্স পরিষ্কারের দ্রবণের কারণে অ্যালার্জি হতে পারে। চোখে চুলকানি, জ্বালা, শুষ্কতা এবং অতিরিক্ত জল পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
৫. দৃষ্টিশক্তির গুরুতর ক্ষতি: বিরল হলেও কর্নিয়ায় গুরুতর সংক্রমণ বা আলসার হলে স্থায়ী দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি হতে পারে। তাই সামান্য অস্বস্তিকেও অবহেলা করা উচিত নয়।
নিরাপদে কালার লেন্স ব্যবহার করবেন কীভাবে?
কালার লেন্স ব্যবহারের আগে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চোখের মাপ ও উপযুক্ত লেন্স নির্বাচন করার জন্য পেশাদার মূল্যায়ন প্রয়োজন। শুধুমাত্র দৃষ্টিশক্তি সংশোধনের প্রয়োজন নেই বলেই যে কোনও লেন্স ব্যবহার করা নিরাপদ, এমন ধারণা ভুল।
লেন্স পরা বা খোলার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। লেন্স পরিষ্কারের জন্য নির্দিষ্ট কন্ট্যাক্ট লেন্স সলিউশন ব্যবহার করতে হবে। কলের জল, সাধারণ জল কিংবা লালা দিয়ে লেন্স পরিষ্কার করা বিপজ্জনক। লেন্স পরা অবস্থায় ঘুমানো এবং সাঁতার কাটা এড়িয়ে চলতে হবে। নির্ধারিত সময়ের বেশি লেন্স ব্যবহার করা যাবে না। একই লেন্স একাধিক ব্যক্তির মধ্যে ভাগ করে ব্যবহার করাও সম্পূর্ণ অনুচিত।
লেন্সের সংরক্ষণের বাক্স পরিষ্কার রাখা এবং নির্দেশ অনুযায়ী পরিবর্তন করাও গুরুত্বপূর্ণ। চোখে অস্বস্তি দেখা দিলে অবিলম্বে লেন্স খুলে ফেলতে হবে। চোখে ব্যথা, অতিরিক্ত লালভাব, আলো সহ্য করতে অসুবিধা কিংবা হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে কোনও চোখের ড্রপ ব্যবহার করা উচিত নয়।
সৌন্দর্যের আগে চোখের সুরক্ষা
ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মেলানো বা নিজের চেহারায় নতুনত্ব আনা দোষের নয়। কিন্তু সাময়িক সৌন্দর্যের জন্য চোখের স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কালার লেন্স ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সঠিক লেন্স নির্বাচন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।