বর্তমান ব্যস্ত জীবনে শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া কিংবা হঠাৎ করে কমে যাওয়ার সমস্যা অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কেউ অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ স্বাভাবিক খাবার খাওয়া সত্ত্বেও ক্রমশ রোগা হয়ে পড়ছেন। অনেকেই বিষয়টিকে সাধারণ শারীরিক পরিবর্তন বলে মনে করে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া কখনও কখনও শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনও সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তাই এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।
ওজন বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ
শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব। বর্তমানে অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে বসে কাজ করেন। হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের অভাবের পাশাপাশি অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার, ফাস্ট ফুড, মিষ্টি, কোমল পানীয় এবং বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে থাকে।
এ ছাড়া পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। মহিলাদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা, মেনোপজ, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএসের মতো সমস্যার সঙ্গেও ওজন বৃদ্ধির সম্পর্ক থাকতে পারে। আবার থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্ষমতা কমে গেলে বা হাইপোথাইরয়েডিজম হলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে, যার ফলে ওজন বাড়তে পারে।
তবে অল্প সময়ে ওজন বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে পা ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে শরীরে জল জমা বা হৃদ্যন্ত্র, কিডনি কিংবা যকৃতের সমস্যার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
হঠাৎ রোগা হয়ে যাওয়ার কারণ
অন্যদিকে, কোনও ব্যক্তি খাদ্যাভ্যাস বা শারীরিক পরিশ্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না এনেও যদি দ্রুত রোগা হয়ে যান, তবে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না খাওয়া, ক্ষুধামন্দা, মানসিক উদ্বেগ, বিষণ্নতা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণে ওজন কমতে পারে।
এ ছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থির অতিসক্রিয়তা বা হাইপারথাইরয়েডিজমের ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া বেড়ে যায়। এর ফলে বেশি খেয়েও ওজন কমতে পারে। ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে ঘন ঘন প্রস্রাব, অতিরিক্ত তৃষ্ণা এবং ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়াও যক্ষ্মা, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, অন্ত্রের বিভিন্ন রোগ, খাবার থেকে পুষ্টি শোষণে সমস্যা এবং কিছু গুরুতর অসুস্থতার কারণে অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস হতে পারে। তাই দ্রুত ওজন কমার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, রাতের বেলা অতিরিক্ত ঘাম, দীর্ঘদিনের কাশি, দুর্বলতা কিংবা ক্ষুধামন্দা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কখন সতর্ক হবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও ব্যক্তি যদি ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে নিজের স্বাভাবিক ওজনের প্রায় পাঁচ শতাংশ বা তার বেশি ওজন অনিচ্ছাকৃতভাবে হারিয়ে ফেলেন, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে, অল্প সময়ের মধ্যে ওজন দ্রুত বেড়ে গেলেও তার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।
চিকিৎসক রোগীর বয়স, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম, মানসিক অবস্থা এবং অন্যান্য উপসর্গ সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে শর্করার মাত্রা, থাইরয়েডের কার্যক্ষমতা, রক্তের অন্যান্য পরীক্ষা কিংবা আরও কিছু পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই পরীক্ষা বা চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
সুস্থ থাকতে কী করবেন?
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ডিম, মাছ এবং অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে। অতিরিক্ত তেল, চিনি, ফাস্ট ফুড ও কোমল পানীয়ের ব্যবহার কমানো উচিত। পাশাপাশি বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটাচলা বা ব্যায়াম করতে হবে।
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত জল পান এবং নিয়মিত ওজন পর্যবেক্ষণ করাও উপকারী। তবে হঠাৎ ওজন বেড়ে গেলে বা কমে গেলে নিজে থেকে ওজন বাড়ানোর ওষুধ, স্লিমিং পিল কিংবা থাইরয়েডের ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।