মৌসুমী পাল
গাজিয়াবাদের এক বহুতল আবাসনে তিন নাবালিকা বোনের রহস্যজনক আত্মহত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা দেশজুড়ে। গভীর রাতে আবাসনের নবম তলার বারান্দা থেকে তারা পরপর নিচে ঝাঁপ দেয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তিনজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। মৃতেরা ছিলেন পাখি (১২), প্রাচি (১৪) এবং ভিশিকা (১৬)।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল তথ্য ঘেঁটে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘কোরিয়ান লাভার গেম’ নামে একটি অনলাইন গেমে আসক্ত ছিল। এই ঘটনা ২০১৩ সালের রাশিয়ান গেম ‘ব্লু হোয়েল’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যে গেমেও একাধিক কিশোর, তরুণ নিজেদের প্রাণ হারিয়েছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ওই তিন নাবালিকার ফোনে ‘কোরিয়ান লাভার গেম’ নামের এই গেমটি মূলত টাস্ক-ভিত্তিক। খেলোয়াড়দের প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু কাজ সম্পন্ন করতে বলা হয় এবং ধাপে ধাপে সেই কাজের প্রকৃতি মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টিকারী হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি বিশ্বের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে কোরিয়ান সংস্কৃতি, কে-পপ কালচার ও ভার্চুয়াল সম্পর্কের আকর্ষণকে কেন্দ্র করে গেমটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে। পরিবারের দাবি, তিন বোনই অধিকাংশ সময় মোবাইল ফোনে কাটাত এবং ধীরে ধীরে বাস্তব জগত থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছিল। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, গেমটির কোনো বিপজ্জনক বা প্ররোচনামূলক নির্দেশ তাদের চরম সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল কিনা।
এই ঘটনার পর আবারও অতীতের ‘ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ’-এর স্মৃতি সামনে আসছে। ১৩ বছর আগে এই অনলাইন চ্যালেঞ্জ দেশজুড়ে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। অভিযোগ ছিল, অংশগ্রহণকারীদের ৫০ দিনের ধারাবাহিক কাজ দেওয়া হতো, যা প্রথমে সাধারণ হলেও পরে আত্মক্ষতি, একাকীত্ব এবং মানসিক নির্যাতনের দিকে ঠেলে দিত। শেষ ধাপে আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ নির্দেশ থাকত বলেও বহু রিপোর্টে উঠে এসেছিল। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক কিশোরের মৃত্যু এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা হয়েছিল, যার ফলে প্রশাসন ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গেম বা অনলাইন চ্যালেঞ্জ কিশোরদের মানসিক দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। ভার্চুয়াল জগতের আবেগঘন সম্পর্ক, গোপনীয়তা এবং চাপের পরিবেশ তাদের পরিবার ও সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ তারা বাস্তব সমস্যার মোকাবিলা না করে বিপজ্জনক সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
গাজিয়াবাদের এই মর্মান্তিক ঘটনা শিশু ও কিশোরদের অনলাইন কার্যকলাপ সম্পর্কে সচেতন করার এক সতর্কবার্তা হিসাবে ধরা যেতে পারে। বর্তমানে বাড়ির কিশোরদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা এবং মানসিক সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর অন্ধকার দিক সম্পর্কে সতর্ক না থাকলে এমন ট্র্যাজেডি ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে বলে মনে করছেন সমাজকর্মী ও মনোবিদরা।
