ওঙ্কার ডেস্ক: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হল।লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর অভিযোগের পাল্টা জবাব দিতে রবিবার একযোগে মাঠে নামলেন বিজেপিশাসিত ১২ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে সাংবাদিক বৈঠক করলেন তাঁরা।
নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করছে কংগ্রেস। তাঁর বিরুদ্ধে রাহুলের অভিযোগের বিরোধিতা করতেই এই পাল্টা কর্মসূচি বলে বিজেপি সূত্রে জানানো হয়েছে। বিজেপির তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাহুল গান্ধী এবং বিরোধী জোট কোনও ভিত্তি ছাড়াই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির ভাবমূর্তি নষ্ট করার চক্রান্ত চলছে বলেও অভিযোগ করেছে গেরুয়া শিবির। যে রাজ্যগুলিতে বিজেপি বা এনডিএ ক্ষমতায় নেই, সেখানে দলের রাজ্য সভাপতি অথবা বিধানসভার বিরোধী দলনেতারা সাংবাদিক বৈঠক করেন। এরই মধ্যে রবিবার সমাজমাধ্যম ‘এক্স’-এ রহস্যময় বার্তা দেন রাহুল গান্ধী। তিনি লেখেন, সমুদ্র উত্তাল থাকলেও সেখানে সাঁতার কাটতে তাঁর ভাল লাগে। তাঁর বক্তব্য, এমন পরিস্থিতি তাঁকে শেখায় যে অশান্তিও এক ধরনের শান্তি। তবে জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে অবস্থান থেকে সরেনি কংগ্রেস। সোমবার দেশজুড়ে জেলা স্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। তার আগে রবিবার কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল এক ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। সেখানে দেশের এক হাজারেরও বেশি জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি যোগ দেন।
জ্ঞানেশ কুমারের দায়িত্বকালে নেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে কংগ্রেস। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অন্দরের মতবিরোধের কথা সামনে আসে। সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু ও বিবেক যোশী। বিশেষ করে ভোটার তালিকার চলতি স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি নিয়ে তাঁদের আপত্তির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর পর নির্বাচন কমিশন দু’বার এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। কমিশন আপত্তির বিষয়টি অস্বীকার করেনি। তবে তাদের বক্তব্য, সেগুলি ছিল মতপার্থক্য। আলোচনার মাধ্যমে সেগুলির সমাধান হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ভাবেই নেওয়া হয়েছে বলে কমিশনের দাবি। সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী এখনও সংবাদমাধ্যমের সামনে এ বিষয়ে মুখ খোলেননি। শনিবারের কমিশনের দ্বিতীয় বিবৃতিতে অবশ্য একাধিক পদক্ষেপ এবং তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেসের দাবি, তাতেও তাদের মূল প্রশ্নগুলির উত্তর মেলেনি।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রকাশের পরের দিনই সাংবাদিক বৈঠক করেন রাহুল। তাঁর দাবি ছিল, তাঁর ‘ভোট চুরি’ সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা এখন সামনে এসেছে। জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে অথবা তাঁকে সরাতে হবে বলেও দাবি করেন তিনি। রাহুল জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’-এর অভিযোগও তোলেন। তাঁর আরও অভিযোগ, দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির চিঠি নিয়ে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জ্ঞানেশ কুমারকে আড়াল করছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি বিধানসভা নির্বাচনেও কারচুপি হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন কংগ্রেস নেতা। বিজেপি অবশ্য এই অভিযোগ মানতে নারাজ। দলের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক বিবৃতিতেই যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। সেই বক্তব্যই রবিবার বিভিন্ন রাজ্যের রাজধানী থেকে তুলে ধরেন বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরা। বিজেপির দাবি, বিরোধীদের প্রতিটি অভিযোগের জবাব দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। শনিবার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বৈঠককে ‘যৌথ সাংবাদিক বৈঠক’ হিসেবেও উল্লেখ করেছে দলটি।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীস বলেন, ভোট চুরি হয়নি। তাঁর কটাক্ষ, বরং রাহুল গান্ধীর ‘বুদ্ধিই চুরি হয়ে গিয়েছে’। সংবিধান রক্ষার কথা বলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে বদনাম করে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের অভিযোগ, এসআইআর নিয়ে বিরোধীরা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে ‘পরাজিতদের জোট’ বলে কটাক্ষ করেন। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধরীর বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধন করা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, দেশে বুথ দখলের মতো পুরনো পদ্ধতি আর কার্যকর নয়।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এসআইআর নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থানকে প্রশ্ন করেন। তাঁর দাবি, কেরলে নির্বাচনী সুবিধা পাওয়ার কারণে কংগ্রেস সেখানে এসআইআর সমর্থন করছে। কিন্তু বাংলায় নির্বাচনে হারের পর একই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে। উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিংহ ধামি বলেন, গণতন্ত্রে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। তবে অভ্যন্তরীণ আলোচনার নথিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরে কোনও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে বদনাম করা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী ভজনলাল শর্মার অভিযোগ, নির্বাচনী পরাজয় আড়াল করতেই বিরোধীরা মিথ্যা প্রচার করছে। দেশজুড়ে এসআইআর সংক্রান্ত ২৪ জুন, ২০২৫-এর নির্দেশ নিয়ে কংগ্রেস আগে তথ্য যাচাই করেনি কেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, ওই সিদ্ধান্ত পূর্ণ ঐকমত্যের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছিল। ছত্তীসগঢ়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণুদেও সাই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। তাঁর দাবি, শতাধিক নির্বাচনে পরাজয়ের পর কংগ্রেস ‘দেশবিরোধী’ আচরণের পথে গিয়েছে। তিন নির্বাচন কমিশনারের যৌথ বিবৃতি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চক্রান্তকে সামনে এনেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাও বিরোধীদের নিশানা করেন। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের বিষয়টি তুলে বিরোধীরা নিজেদের ব্যর্থতা থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে চাইছে। কংগ্রেসের শাসনকালে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা কতটা ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রেখা। তাঁর দাবি, সেই সময়ে কমিশন কংগ্রেসের নির্দেশেই কাজ করত। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নায়ব সিং সাইনি বলেন, বিরোধীদের হাতে এখন কার্যত দু’টি কাজই রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করা অথবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অপমান করা। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবও রাহুল গান্ধীকে আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, নিজের দল এবং পরিবার সামলাতে না পেরে রাহুল মিথ্যা প্রচার করছেন। একই সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্য বিজেপি সভাপতি হেমন্ত খণ্ডেলওয়ালও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তোলেন।
গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পটেলও নির্বাচন কমিশন নিয়ে কংগ্রেসের অবস্থানের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেস নির্বাচনে জিতলে সেটিকে গণতন্ত্রের জয় এবং কমিশনের নিরপেক্ষতার প্রমাণ বলে। কিন্তু বিজেপি জিতলেই ভোট চুরি ও কারচুপির অভিযোগ তোলে। দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির প্রসঙ্গও তোলেন ভূপেন্দ্র। সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক জিডিপির পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশে পৌঁছেছে। তাঁর দাবি, দেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পথে এগোচ্ছে।