
নিজস্ব সংবাদদাতা : হাওড়ায় রামনবমী উপলক্ষে জোড়া মিছিলে অনুমতি দিল কলকাতা হাই কোর্ট। তবে তা শর্তসাপেক্ষে একথাও জানিয়ে দিয়েছেন বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ। শর্তগুলি হল- মিছিলে ধাতুর তৈরি কোনও অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। দুই সংগঠন মিলে মোট এক হাজার মানুষ মিছিলে যোগ দিতে পারবেন। যদিও তাদের নাম-পরিচয় আগে থেকে জানাতে হবে পুলিশকে। সেই সঙ্গে, মিছিলে হাঁটার সময় প্রত্যেকের কাছে যাতে নাম-পরিচয় লেখা কার্ড থাকে তাও জানিয়েছে আদালত।
রামনবমীতে মিছিল করতে চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদন জানিয়েছিল অঞ্জনীপুত্র সেনা এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নামে দু’টি সংগঠন।পুলিশ তাঁদের অনুমতি না দেওয়ায় কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের করে তারা। এই মামলায় রাজ্যের বক্তব্য, অতীতে রামনবমীকে কেন্দ্র করে হাওড়ার ওই এলাকায় অশান্তির নজির রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার অনুমতি দেয়নি পুলিশ। এটা একটা সতর্কতা মূলক পদক্ষেপ। যার প্রেক্ষিতে বিচারপতি ঘোষের মন্তব্য, ‘‘দুর্গাপুজোয় কোথাও গন্ডগোল হলে কি পুজো বন্ধ করে দেওয়া হয় ? কোনও এলাকা নিয়ে পুলিশের আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা থাকলে তা রাজ্যের পক্ষে ভাল দেখায় না। ওই জায়গায় কি প্রতি দিন গন্ডগোল হয়?’’ এর পরেই মিছিলের অনুমতি দেয় হাই কোর্ট।
৬ এপ্রিল রবিবার দেশ জুড়ে ঘটা করে পালিত হতে চলেছে রামনবমী। বাদ নেই পশ্চিমবঙ্গও। তাই বিশেষ সতর্কতা নিচ্ছে রাজ্য সরকার। রাজ্যজুড়ে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি, বাতিল করা হয়েছে পুলিশের সব কর্মীর ছুটি। ২ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সব পুলিশ কর্মীদের ছুটি বাতিল করার বিজ্ঞপ্তি আগেই জারি করা হয়েছিল। এবার আরও কড়া পদক্ষেপ নিল রাজ্য সরকার, ৫ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে বিশেষ নজরদারি রাখবে নবান্ন।
পুলিশের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, হাওড়া শহর ও গ্রামীণ এলাকা, ব্যারাকপুর, চন্দননগর, শিলিগুড়ি, মালদহ, ইসলামপুর ও কোচবিহারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। এসব এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, সঙ্গে থাকছেন উচ্চপদস্থ আধিকারিকরাও।
২ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা মাথায় রেখে হাওড়া সদরের দায়িত্ব সামলাবেন ছয়জন পুলিশ অফিসার, যার মধ্যে থাকছেন এক জন আইজি পদমর্যাদার অফিসার, তিনজন ডিআইজি ও এক জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ২০২৩ সালে রাম নবমীরর দিন, রাম-নবমীর শোভাযাত্রার সময় উত্তেজিত হয়ে ওঠে হাওড়া। সেবার হাওড়ায় রাম নবমীর শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন দীলিপ ঘোষ, শুভেন্দু অধিকারী সহ বিজেপির অন্যান্য নেতৃত্বের। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার জেরে , ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল হাওড়ার বেশ কয়েকটি জায়গায়।
অপরদিকে ২০১৮ সালে একই রকমভাবে উত্তেজিত হয় উঠেছিল আসানসোল, প্রাণ হারিয়েছিলেন কিছু এবং আহত হয়েছিলেন বেশ কিছু। প্রাণ হারিয়েছিল নূরানি মসজিদের ইমাম মৌলানা ইমদাদুল রাশিদি এর পুত্রও। তাই সব সরকম সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে হাওড়া সহ ব্যারাকপুর, চন্দননগর, শিলিগুড়ি, মালদহ, ইসলামপুর ও কোচবিহারেও বিশেষ নজরদারিতে থাকবেন শীর্ষ পুলিশ আধিকারিকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাড়তি সতর্কতার কারণ শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নয়, এর সঙ্গে গভীর রাজনৈতিক সমীকরণও জড়িত। বছর ঘুরলেই বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে রামনবমীকে সামনে রেখে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সব রাজনৈতিক দলই। স্বভাবতই, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে সরকার কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। তাই স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করে শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামলানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, অতীতে রামনবমী উপলক্ষে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলেই কি এত বাড়তি নজরদারি ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে আরও বড় রাজনৈতিক কৌশল? রাজ্যের শাসকদল বিজেপির উত্থানকে ঠেকাতে প্রশাসনিকভাবে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে বলেই রাজনৈতিক মহলের একাংশের অভিমত। যদিও দিলীপ ঘোষ, শুভেন্দু অধিকারী এবং অগ্নি মিত্রা পাল ইতিমধ্যেই বারংবার রাম নবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তার প্রত্তুতরেই কী এতো কড়া পুলিশি নিরাপত্তার কথা ভাবল তৃণমূল সরকার ? তবে পুলিশি তৎপরতা কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে!