অর্পিতা মুখার্জি, কলকাতা: মেডিক্যাল কলেজ পরিচালনায় কড়া অবস্থান নিল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। শুক্রবার স্বাস্থ্য ভবনে রাজ্যের সব মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের নিয়ে বৈঠক করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। সেখানেই তিনি জানিয়ে দেন, শিরদাঁড়া সোজা রেখে প্রশাসন চালাতে হবে। তা না পারলে অধ্যক্ষের চেয়ারে থাকার প্রয়োজন নেই।
মন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরেই চিকিৎসক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, শিরদাঁড়া সোজা রাখার অর্থ কি সরকারের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা? সরকারি হাসপাতালে যে ভয় দেখানোর সংস্কৃতি রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে, তা এখনও কেন চলছে? একাংশের মতে, সরকারের চাপ উপেক্ষা করে হাসপাতালের প্রকৃত সমস্যা নিয়ে মুখ খোলাই আসল সাহসের পরিচয়।
গত ১৭ অক্টোবর চোরবাগানে পদপিষ্টের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুর পর সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশ। আহতদের কেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে দ্রুত বেসরকারি হাসপাতালে পাঠাতে হল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে স্বাস্থ্য ভবনের কন্ট্রোলরুম থেকে জানান, সরকারি হাসপাতালে এখনও বহু আধুনিক পরিষেবা নেই, তাই প্রাণ বাঁচাতে বেসরকারি হাসপাতালের সাহায্য নিতে হয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে নতুন সরকারের অন্তত দু’বছর লাগবে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে কারা ডিউটি ফেলে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, তার রিপোর্টও তলব করেন।
সরকার বদলের ছ’মাসের মধ্যেই জুনিয়র ডাক্তারদের সরকার-বিরোধী মন্তব্য স্বাস্থ্য ভবনের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই পটভূমিতেই অধ্যক্ষদের এই বার্তা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্ত্রীর বার্তার কড়া সমালোচনা করেছেন চিকিৎসক নেতা সুবর্ণ গোস্বামী। তাঁর বক্তব্য, জুনিয়র ডাক্তাররা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করে বেসরকারি হাসপাতালের প্রচারের বিরোধিতা করেছেন বলেই তাঁদের নিশানা করা হচ্ছে। অধ্যক্ষরা যদি শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সরকারি হাসপাতালের ঘাটতির কথা বলতে পারেন, তবেই তাঁদের শিরদাঁড়া প্রমাণিত হবে।
ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকী বলেন, মন্ত্রী শিরদাঁড়া সোজা রাখতে বলছেন, কিন্তু স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গেড়ে বসা থ্রেট সিন্ডিকেটের মেরুদণ্ড ভাঙার সাহস কি সরকার দেখাবে? তাঁর অভিযোগ, সরকার বদলালেও যদি পুরনো ব্যবস্থার কারিগররাই পদে থেকে যান, তবে ব্যবস্থা বদলাবে না। তৃণমূল জমানায় যাঁদের বিরুদ্ধে থ্রেট কালচারের অভিযোগ উঠেছিল, তাঁদের অনেকেই এখনও গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। সন্দীপ ঘোষ জামিনে মুক্ত হয়েছেন। থ্রেট কালচার শেষ হয়নি, শুধু বাইরের রং বদলেছে। তিনি সর্বস্তর থেকে সিন্ডিকেট, তোলাবাজি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানান।
আরজি কর আন্দোলনের মুখ অনিকেত মাহাতো বলেন, আগের সরকারের আমলে নবান্নে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীও একই ভাবে অধ্যক্ষদের হুমকি দিয়েছিলেন। এখন একই সুর ফিরে আসছে। প্রশ্ন হল, শিরদাঁড়া সোজা রাখার মানে কি কলেজের স্বাধিকার, নাকি স্বাস্থ্য ভবনের কথা মতো চলা? স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে চিকিৎসক এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাই তিনি যেন প্রশাসক হয়ে কলেজের স্বাধিকারের গুরুত্ব ভুলে না যান।
যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক পুণ্যব্রত গুণ বলেন, চোরবাগানের দিন জুনিয়র ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অসাধারণ কাজ করেছেন। তাঁরা পরিকাঠামোর অভাবের কথা বলেছেন কারণ তাঁরা মানুষকে পরিষেবা দিতে চান। উন্নয়নের দিকে নজর না দিয়ে চিকিৎসকদের আক্রমণ করা দুর্ভাগ্যজনক।
অন্যদিকে সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম প্রধান এবং ডায়মন্ড হারবারের প্রাক্তন অধ্যক্ষ উৎপল দাঁ-র উদাহরণ টানছেন অনেকে। তাঁরা তৃণমূল আমলে অভীক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাসদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন। অথচ তাঁদের জন্য কোনও দৃষ্টান্ত তৈরি হয়নি। উল্টে যাঁরা আগে শিরদাঁড়া বেঁকিয়ে চলতেন, তাঁরাই এখনও শীর্ষ পদে রয়েছেন বলে অভিযোগ।
এদিকে জুনিয়র ডাক্তারদের টাকার বিনিময়ে ডিউটি বিক্রি এবং অধ্যক্ষ ও এমএসভিপি-দের একাংশের প্রশাসক পদে থেকেও বেসরকারি প্র্যাকটিসের অভিযোগ নিয়ে চিকিৎসক সংগঠনগুলি চুপ রয়েছে। স্বাস্থ্য ভবনের এক কর্তার কথায়, বৈঠকের একটি লাইন নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, কিন্তু কেন এই আলোচনার প্রয়োজন হল, সেটাও ভেবে দেখা উচিত।