তাপস মহাপাত্র
নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে অভিহিত করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সেইসঙ্গে অবিলম্বে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেছেন তিনি। জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগের জন্য ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যেই রাহুল এই কড়া আক্রমণ শানান। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লির ইন্দিরা ভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে বোঝাতে চান ভোট চুরির ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী ছিল। রাহুল এদিন জোরের সঙ্গে বলেন, মোদী ও শাহের বিরুদ্ধে তদন্ত হবেই। তিনি জানান, বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে—এ বিষয়ে তিনি ১০০ শতাংশ নিশ্চিত। এরফলে গণতন্ত্র কী ভাবে প্রভাবিত হয় তা জানাতে গিয়ে রাহুল বলেন, “এটি দেশের সংবিধান ও আইনি কাঠামোর ওপর একটি আঘাত। তাঁর অভিযোগ, ভোট প্রক্রিয়া সুরক্ষিত রাখা দায়িত্ব ছিল নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু তা যে আদৌ মেনে চলেনি কমিশন সে ব্যাপারে তাঁর কাছে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। তাঁর সাফ কথা, এর পরিণাম ভোগ করতে হবে। তাঁরা গণতন্ত্রকে ধ্বংস হতে দেখে চুপ করে বসে থাকবেন না। “যারা এর জন্য দায়ী, তাদের শাস্তি পেতেই হবে,” বলে জানিয়ে দেন রাহুল।
তিনি জ্ঞানেশ কুমারকে পরামর্শ দেন যে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের উচিত সরকারি সাক্ষী হয়ে যাওয়া। কারণ, তাহলে এটা হবে একটি দেশপ্রেমমূলক কাজ। রাহুল বলেন, “যা কিছু করা হচ্ছে, তার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ—উভয়ের বিরুদ্ধেই তদন্ত হবে। এই ষড়যন্ত্রের মূলে রয়েছেন তাঁরাই এবং দেশের প্রতি তাঁরা যা করেছেন, তার জন্য তাঁদের তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে।” তাঁদের এই ভোট ধ্বংস করাকে ‘দেশদ্রোহীতা’ বলে মন্তব্য করেছেন রাহুল।
সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল কয়েকটি ভিডিও দেখান এবং মানুষকে মোদী ও শাহের কথা বলার ভঙ্গি সামনে আনেন। ওই ভিডিওগুলিতে অমিত শাহকে বলতে শোনা যায় যে বিজেপি ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রীকে ‘আব কি বার ৪০০ পার’—স্লোগানটি দিতে দেখা যায়। যা ছিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির মূল নির্বাচনী স্লোগান।
রাহুল বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে কাজ করা কোনো রাজনৈতিক নেতাই এমন মন্তব্য করতে পারেন না। তিনি বলেন, ভারতে ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনরোষের একটি মৌলিক শক্তি কাজ করে, যা কাউকেই রেহাই দেয় না। রাহুল বলেন, “ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন, কিন্তু এক-দু’বছরের মধ্যেই ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনরোষের কারণে তাঁর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। একের পর এক নেতার ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটেছে। কিন্তু মোদী, শাহ বা বিজেপির ক্ষেত্রে এমনটা ঘটছে না। কেন, তার উত্তর এখন আমরা জানি।”
রাহুলের যুক্তি, “আমরা কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তা বা সরকারের কার্যকারিতা বুঝতে পারি, কিন্তু ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনরোষ বা ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’র অস্তিত্বই থাকবে না—এমনটা কীভাবে সম্ভব ? এমনকি সাদ্দাম হোসেনের ইরাক বা উত্তর কোরিয়াতেও এমনটা দেখা যায় না।” রাহুল বলেন, ভোট হল আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তি, আর নির্বাচন কমিশনের সুরক্ষায় থাকা সেই ভোটই সংবিধানকে রক্ষা করে। তিনি আরও বলেন, “যদি ভোটব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়, তবে আমাদের সংবিধানও ধ্বংস হয়ে যাবে; তখন আর তার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। সংবিধান ধ্বংস হলে আইনগুলো বেআইনি হয়ে পড়বে এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো অর্থ থাকবে না। কারণ, ভোট চুরি হলে সংবিধান অকার্যকর হয়ে পড়ে, তার ফলে আইন হয়ে যায় বে-আইন আর এবং সেখান থেকেই আসে প্রতিষ্ঠানগুলি ধ্বংস হয়। ”
বুধবার ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ সংবাদপত্রে দেশের নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে প্রকাশিত অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই দেশ জুড়ে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ‘স্বেচ্ছাচারিতা’র বিরুদ্ধে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশীর তোলা অভিযোগ নিয়ে উত্তাল দেশের বিরোধী রাজনীতি। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টিও। যারা ইতিমধ্যে যন্তর-মন্তরের পুনোরাবৃত্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই আবহে বৃহস্পতিবার ভিডিয়ো প্রেজ়েন্টেশন এবং সাংবাদিক বৈঠক করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধী।