ওঙ্কার ডেস্ক: একাধিক বার ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও পাকিস্তানকে মোট অঙ্কের ঋণ দিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফ। এবারও পাকিস্তানের উপর প্রায় ৩৩০ কোটি ঋণ-এর সবুজ সিগন্যাল দিয়েছে ঐ আন্তর্জাতিক সংস্থা। কিন্তু এবার আগের ৫৩ টি শর্তের সঙ্গে আরও ১১টি শর্ত দেওয়া হয়েছে সংস্থার তরফ থেকে। আইএমএফ জানিয়েছে পাকিস্তান এইসব শর্ত মানলেই বাকি টাকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি পাকিস্তানের ১০ জন মন্ত্রককে বিশেষ তথ্য শেয়ার করার কথাও জানিয়েছে আইএমএফ।
পাকিস্তানের জন্য আইএমএফের নতুন শর্ত সাপেক্ষ প্যাকেজকে অনেকেই আমেরিকার এক প্রকার কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন। মোট প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের এই সহায়তা প্যাকেজের বিনিময়ে ইসলামাবাদকে ১৮ মাসে ৬৪টি কঠোর শর্ত মানতে হবে। অর্থনীতি পুনর্গঠনের নামে যে শর্তগুলো আরোপ করা হয়েছে, তা পাকিস্তানের আর্থিক কাঠামোকে প্রায় সম্পূর্ণ নতুন করে গড়তে বাধ্য করবে এমনটাই মেনে নিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা
পাকিস্তানকে এই অর্থ সাহায্য নিয়ে বরাবর আপত্তি জানিয়েছে দিল্লি। দিল্লির কথায় দেশের অভ্যন্তরীণ খাতে ব্যবহারের জন্য টাকা চেয়ে তা নানা দুর্নীতিতে কাজে লাগাছে পাকিস্তান। তাই একাধিক বার ইসলামাদকে কোনো ঋণ বরাদ্দ করার আগে তা খতিয়ে দেখতে বলেছিল ভারত।
অন্যদিকে, গত কয়েক মাস ধরে দিল্লি এবং ওয়াশিংটনের সম্পর্ক অস্বস্তিকরভাবে টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে অবস্থানের ফারাক, বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে মতভেদ এবং ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বদলে যাওয়া, দুই দেশের সম্পর্কের ওপর একটা অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ভারত, চিন এবং রাশিয়া ক্রমশ আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং বহুপাক্ষিক ফোরামে তিন দেশের সমন্বয় বৃদ্ধি পাক এমন ছবি দেখে উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের প্রভাব ধরে রাখতে নতুন কূটনৈতিক কৌশল বেছে নিয়েছে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এই ভোলবদলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাকিস্তানকে ঘিরে আমেরিকার কঠোর অবস্থান।
কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি অংশীদারি বাড়ানো, আমলাদের সম্পত্তি প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, দুর্নীতি দমন সংস্থার শক্তি বাড়ানো, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সংক্রান্ত নতুন আইন এই সব ক্ষেত্রেই দফায় দফায় পরিবর্তন আনতে হবে পাকিস্তানকে। প্রতিটি শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করবে ঋণের ধাপে ধাপে মঞ্জুরি। ফলে আমেরিকার সমর্থন ছাড়া এমন কঠোর শর্ত আরোপ সম্ভব নয় বলেই আন্তর্জাতিক মহলের মত। এর ফলে পাকিস্তানকে চাপের মুখে ফেলে ওয়াশিংটন যেন ভারতের কৌশলগত স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য পাকিস্তানের আগের ঋণ ইতিহাসটিও গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশকে পাকিস্তান বহুবার আইএমএফের দ্বারস্থ হয়েছে। ১৯৮৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ২৩ বারের বেশি বিভিন্ন ঋণ ও সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পড়েছে তারা। ২০১৫ সালে নেওয়া প্রায় ৬.৬ বিলিয়ন ডলার ২০১৯-এর ৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩ সালে নেওয়া ৩ বিলিয়ন ডলার। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কঠোর শর্ত মানতে হয়েছে এবং প্রতিবারই আর্থিক স্থিতিশীলতার বদলে ঋণের বোঝা আরও বেড়ে গেছে। প্রতিটি ঋণের পরে কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি আবারও সংকটে পড়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।
ভারত এই পুরো ঘটনাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে আমেরিকার এই কঠোরতা দিল্লির সঙ্গে দূরত্ব কমানোর এক প্রচেষ্টা বলে মনে করছে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
