তাপস মহাপাত্র
নির্বাচন কমিশন ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের মধ্যেই ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের দাবিটি ফের সামনে আনলো ‘ইন্ডিয়া’ জোট। নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফেরাতে এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছে কংগ্রেস। বুধবার দিল্লির কনস্টিটিউশন হলে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে প্রারম্ভিক ভাষণে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ করা উচিত। সেইসঙ্গে ভোটার তালিকায় ‘হস্তক্ষেপকারী’ শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে এগিয়ে আসা উচিত। কংগ্রেস সভাপতির দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের আসল রূপ এখন সবার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে। খাড়গে বলেন, “গত ১০ মাসে তাঁর দুই সহকর্মী সদস্য ১৪ বার চিঠি লিখেছেন! এটি তাঁর সততা ও উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তোলে। তাই তাঁকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত। যদি তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র সাংবিধানিক বা নৈতিক লজ্জা অবশিষ্ট থাকে, তবে তিনি নিজেই পদত্যাগ করবেন এবং ভোটার তালিকায় যারা হস্তক্ষেপ করছে, সেই শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে দাঁড়াবেন।” তিনি আরও বলেন, বিরোধী জোট স্বচ্ছতার জায়গায় গোপনীয়তাকে স্থান দেবে না। এদিন বৈঠকে তিনি বলেন, “এবং আমরা আমাদের গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি—’একজন ব্যক্তি, একটি ভোট, একটি মূল্য’—তাকে দুর্বল হতে দেব না।”
জোটের নেতাদের সামনে খাড়গে জোরের সঙ্গে বলেন, “ব্যালট জনগণের এবং জনরায়ও জনগণের। সুতরাং, সরকারের ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতেই ন্যস্ত থাকে।” খাড়গে আরও বলেন, “ভারতের জনগণই যেন আমাদের গণতন্ত্রে চূড়ান্ত ও অবিসংবাদিত ক্ষমতার উৎস হিসেবে টিকে থাকে এটা নিশ্চিত করা আমাদের কাজ।” তিনি প্রস্তাব দেন, ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দাবি জানানো উচিত যাতে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ‘এসআইআর’ –এর পূর্ববর্তী ভোটার তালিকা ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিটি পর্যায়ে—যার মধ্যে রয়েছে নতুন নাম সংযোজন, বাদ দেওয়া এবং তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকা ও বুথ-ভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য তার ‘সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা’ নিশ্চিত করার দাবি ‘ইন্ডিয়া’ জোটভুক্ত দলগুলোকে জানাতে হবে।
খাড়গে আরও দাবি, কোনো বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগে যেন যথাযথ নোটিশ ও কারণ দর্শানো হয় এবং একটি কার্যকর আপিল ব্যবস্থা রাখা হয়। তিনি বলেন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নথিপত্রের ঘাটতি বা সচেতনতার অভাবের কারণে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়া থেকে রক্ষা করার বিষয়টিও দলগুলোর নিশ্চিত করতে হবে। ইভিএম-এর পরিবর্তে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের পক্ষে মত দেওয়ার পাশাপাশি তিনি তরুণ নাগরিক, বিশেষ করে যারা প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন, তাদের জন্য সহজ ও সুলভ ভোটার রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থার ওপর জোর দেন। খাড়গে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং এমন একটি নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন যা সব রাজনৈতিক মহলের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম। তিনি বলেন, “নাগরিকদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার যখন ঝুঁকির মুখে, তখন ‘ইন্ডিয়া’ জোটভুক্ত দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। তাই এই বৈঠক থেকে আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বের হতে হবে।”
কংগ্রেস সভাপতি বলেন, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং এমন একটি দেশ যার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে একটি সহজ অথচ গভীর নীতির ওপর। যা হল- দেশের সরকার নির্বাচনে প্রতিটি নাগরিকের সমান কণ্ঠস্বর বা অধিকার থাকতে হবে। তিনি বলেন, “‘একজন ব্যক্তি, একটি ভোট, একটি মূল্য’—এই নীতিটিই আমাদের গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। আজ সেই নীতিই গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে।” তিনি উল্লেখ করেন, সারা দেশেই নাগরিক ও রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনের কার্যপদ্ধতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। তিনি বলেন, “বছরের পর বছর ধরে আমরা ইভিএম নিয়ে জবাব চেয়ে আসছি। ভোটার তালিকা কারচুপি এবং নির্বাচনী তালিকায় অস্পষ্ট বা কারণহীন পরিবর্তনের বিষয়ে আমরা প্রশ্ন তুলেছি। রাহুল গান্ধী প্রমাণসহ দেখিয়েছেন যে মহাদেবপুরা, আলান্দ, হরিয়ানা এবং মহারাষ্ট্রে এমনটা ঘটেছে। একইভাবে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দলগুলোও এ বিষয়ে প্রশ্ন ও আপত্তি জানিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।” খাড়গে বলেন, আমাদের অভিযোগগুলো আমলে নেওয়ার পরিবর্তে নির্বাচন কমিশন সেদিকে চোখ বন্ধ করে রেখেছিল।
খাড়গে বলেন, “আমাদের দেওয়া পর্যাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের মুখে কোণঠাসা হয়ে নির্বাচন কমিশন ‘এসআইআর’-এর পথ বেছে নেয়। নির্বাচন কমিশন বলে যে, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হল- ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত ও সমসাময়িক করা। কিন্তু যখন এই প্রক্রিয়ার ফলে বিপুল সংখ্যক ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান বা তাঁদের যোগ্যতার প্রমাণ নতুন করে দিতে হয়, তখন কোনো প্রকৃত ভোটার যাতে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করার দায়ভার অবশ্যই ব্যবস্থার ওপর বর্তায়।” তাঁর কথায়, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে ভোটার তালিকা থেকে ১৩.৩ কোটি ভোটারকে সরাসরি বাদ দেওয়া হয়েছে; তিনি আরও যোগ করেন যে, এর মাধ্যমে গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের তাঁদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, কারা ক্ষমতায় আসবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সাধারণ ভোটারদেরই থাকা উচিত, যারা ক্ষমতায় আছেন তাঁদের নয়। “যদি নাম বাদ দেওয়া হয়, তবে কাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তা আমাদের জানতে হবে। কেন বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটাও আমাদের জানা প্রয়োজন” বলে জানিয়েছেন খাড়বে।
তিনি বলেন, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে যেমনটি কল্পনা করা হয়েছে, তেমন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ছাড়া কোনো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না। তাঁর কথায়, “এখন আমরা বুঝতে পারছি কেন প্রধানমন্ত্রী ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলি ও কার্যকাল) বিল, ২০২৩’ এনেছিলেন—যার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের প্যানেল থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে সেখানে একজন মন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।” তাঁর অভিযোগ, এই বিলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারকে আজীবন দায়মুক্তি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। “কারণ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ এমন একজনকে চান যিনি কেবল নামমাত্র পদ আঁকড়ে থেকে তাঁদের ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করবেন। আসলে তাঁরাই এর জন্য প্রকৃত দায়ী।” খাড়গে আরও বলেন যে, নির্বাচন কমিশন প্রথমবার ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার জন্য ‘ফর্ম ৬’-এর নিয়মে পরিবর্তন এনেছে, যার মাধ্যমে তরুণদের ভোটদানে ইচ্ছাকৃতভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
ইভিএম (EVM) প্রসঙ্গে খাড়গে বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।” তিনি বলেন, বিজেপি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এই মেশিনগুলো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়, তাই “আমরা তাদের আর এই মেশিনগুলো ব্যবহার করতে দিতে পারি না।” খাড়গে বলেন, “ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে আমাদের অবশ্যই ব্যালট পেপার বা ব্যালট ভোটের পদ্ধতিতে ফিরে যেতে হবে।”
এই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ছিল—কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস, এনসিপি (এসপি), শিবসেনা (ইউবিটি), রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সিপিআই(এম), সিপিআই, জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স, জম্মু ও কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা, সিপিআই-এমএল, আইইউএমএল, কেরালা কংগ্রেস (এম), মারুমালারচি দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগাম, বিদুতলাই চিরুথাইগাল কাচি, রেভোলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি, কেরালা কংগ্রেস (জ্যাকব) এবং অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক। রাজ্যসভার নির্দল সাংসদ কপিল সিবালও এই বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন।