অর্ণব দত্ত
শিল্পী কল্পনা করেছিলেন, ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে। এই লাইনটি মিলেছে, কিন্তু উল্টোভাবে। ব্যাখ্যা করে বললে যত না হাস্যকর শোনাবে, তার চেয়েও দুভার্গ্যজনক লাগবে। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনধীনে থাকার সময়ে ভারতবাসীকে গেলানো হয়েছিল একটি কথা। তা হল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য নাকি অস্ত যায় না। কিন্তু অসংখ্য স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীর অবদানে, রক্তের বিনিময়ে গোটা দেশটা স্বাধীন হয়েছে। পরাধীন আমলে দেশকে স্বাধীন করার কাজে যাঁরা জীবনব্যাপী আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁরা রাজনীতিকই ছিলেন। অনেকে ফাঁসির মঞ্চে জীবন দিয়েছেন, সহিংস এবং অহিংস পথে রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ভিতর মতভেদ যে হয়নি, তাও নয়। মানুষে-মানুষে মতভেদ থাকবেই। এটাই স্বাভাবিক।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এজন্যে বলেছিলেন, “যত মত, তত পথ।“ দেশটা স্বাধীন হওয়ার আগে ১৯২৫ সালে বিজয়া দশমীর দিন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের জন্ম হয়। ওই বছরই ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কনফারেন্স হয় ২৬ ডিসেম্বরে। বর্তমানে ভারতের ৭২ শতাংশ ভূখণ্ড শাসনকারী বিজেপি। এদিকে গত ১০০ বছরে ভারতে খেটে খাওয়া মানুষ তথা দরিদ্র মানুষ কিংবা নানাবিধ সামাজিক সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিপ্লব হওয়া তো দূরঅস্ত, সর্বহারার কমিউনিস্টরা খণ্ডবিখণ্ড। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছেন, ভারত থেকে সম্পূর্ণ নির্মুল হয়েছে ভারতীয় সিপিআই (মাওবাদী) পার্টি। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি একসময়ে “ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়” বলে ডাক দিলেও বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টির তালিকা লম্বা।
সকলেই ভোটের রাজনীতিতে সামিল। সারা বিশ্বে যত দেশ রয়েছে, তার মধ্যে ভারতে ১৯৪৭ সালের পরে স্বাধীনতার ৮০ বছরে সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক দল রয়েছে। এও জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভের মতোই!
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির নামোল্লেখ করা পাঠক-পাঠিকাকে একঘেয়ে তথ্য পরিবেশন করার সমার্থক। আসলে মার্কসবাদের জনক কার্ল মার্কস যে সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের দর্শন সৃষ্টি করেছিলেন, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির নেতৃত্ব তা কতদূর পর্যন্ত বুঝেছেন, এও জরুরি প্রশ্ন। ব্যাপারটার সঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙনের তুলনা টানা যেতে পারে। অথবা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শতনামের সঙ্গে তুলনীয়। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ নিজেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে কখনওই দাবি করেনি। বরং আরএসএস দাবি করেছে, এটি একটি সামাজিক তথা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। যদিও একথা কারও অজানা নয়, সঙ্ঘ রাজনৈতিক দল বিজেপির অভিভাবক।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের পেশ করা তথ্য অনুসারে, ভারতে জাতীয় দলের সংখ্যা মোটে ৬টি। আর রাজ্যস্তরের রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৫৭টি। এই দলগুলির রাজনৈতিক কাজকারবার রাজ্যগুলির ভিতর সীমাবদ্ধ। প্রতিটি দলই সংসদীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের কারবারি। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতিহীন রাজনৈতিক দলের সংখ্যা অন্তত ২ হাজার ৬০০টির বেশি।
সারা বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, “গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নত কোনও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি থাকত, তাহলে তিনি সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা কার্যকরী করতে লড়াই করতেন। যেহেতু তা নেই, এজন্যে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা রাখা ব্যতিত অন্য কোনও উপায় নেই।“
এদিকে ভারতে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আরেক সমস্যা হল সুপ্রিমো রাজনীতির উদয়। যেমন, তৃণমূল কংগ্র্স, সমাজবাদী পার্টি, আম আদম পার্টি থেকে শুরু করে ডিএমকে, জেডি (ইউ), নব্য উদিত টিভিকে-এর মতো নানা রাজনৈতিক দল সুপ্রিমো পরিচালিত। এই দলগুলি কার্যত ব্যক্তি মালিকানাধীন সংস্থার মতো।
পরাধীন ভারত এবং স্বাধীনতার ৮০ বছর পরবর্তী ভারতে রাজনীতি এবং রাজনীতিকদের মধ্যে চরিত্রগত ব্যবধান আকাশ-পাতাল। পরাধীন ভারতে বিপ্লবী রাজনীতির পাশাপাশি রাজনীতিকদের একাংশ কিছুক্ষেত্রে অভিজাত সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছিলেন। এঁদের মধ্যে অনেকে আবার ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দিয়েছেন দেশের স্বাধীনতার স্বার্থে। যেমন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধি, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস-সহ অনেকেই এই তালিকার অন্তর্গত। দেশের স্বাধীনতা বর্তমানে যেন বার্ধক্যজনিত রোগের শিকার। বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষা এবং সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টে প্রতিদিন দেখা যাচ্ছে, রাজনীতিকদের লীলাখেলা। ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ আকাশছোঁয়া। দলীয় তহবিলে জমছে নির্বাচনী বন্ডে কর্পোরেট সংস্থাগুলি থেকে আদায় করা হাজার হাজার কোটি টাকা অনুদান।
তবু মন্দের ভালো এই যে, কমিউনিস্ট পার্টিগুলি নির্বাচনী বন্ডে দলীয় তহবিলে টাকা নেয়নি। ককরোচ জনতা পার্টি আন্দোলন শুরু করার পরে রাহুল গান্ধি, প্রিয়াঙ্কা গান্ধির নেতৃত্বে কংগ্রেসও আন্দোলনে সামিল। সবকটি কমিউনিস্ট পার্টি ঐক্যবদ্ধ। ঘোলা জলে মাছ ধরতে সুপ্রিমো রাজনীতিকরা আসরে নামলেও পরিস্থিতি শেষমেশ কী হবে, তা সময়ের অপেক্ষা। কথায় বলে, “ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যেই করেন।“