কুশল চক্রবর্তী
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে দর্শকপুষ্ট খেলায় এখন কোচেদের খুব নামডাক। কিন্তু আবার এটাও প্রবাদ যে কি ফুটবল কি ক্রিকেটে,কোচেদের জীবন পদ্মপাতায় জলের মত। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে সব কিছুই বিচিত্র। রাহুল দ্রাবিড়কে সরিয়ে যখন প্রায় কণ্টকশূন্য ভাবে আনা হয়েছিল একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি জড়িত গৌতম গম্ভীরকে, তখনি কেউ কেউ অবাক হয়েছিলেন। গৌতম গম্ভীর যে কোচিং এর ব্যাপারে একবারে আনকোরা তা কিন্তু বলা যাবে না। তবে ভারতীয় টেস্ট দলের মত দলের কোচ হবার মত এলেম তাঁর আছে কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। ২০২৪ সালের ৯ জুলাই ভারতীয় টেস্ট দলের দায়িত্ব নেবার পর থেকে কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে দেখা গেল। এখন অবধি গৌতম গম্ভীরের তত্ত্বাবধানে ১৯টা টেস্ট খেলছে ভারত। তাতে হেরেছে ১০টি টেস্ট আর জিতেছে মাত্র ৭টি টেস্ট। নিজেদের দেশে ভারত জিতেছে বাংলাদেশ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে। বিশ্ব ক্রিকেটের তালিকায় এখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্থান ৮ নম্বরে আর বাংলাদেশের স্থান ৯ নম্বরে। আর নির্মমভাবে হেরেছে নিজের দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ড (৩-০) আর দক্ষিণ আফ্রিকার (২-০) কাছে আর অস্ট্রেলিয়ার কাছে (৩-১) হেরেছে তাদের দেশে। আর ইংল্যান্ডে গিয়ে সিরিজ “কৃত্তিত্বের” সঙ্গে ড্র করেছে।
এই ঘটনার ফাঁকে, গৌতম গম্ভীরের তত্ত্বাবধানে থাকা ভারতীয় টেস্ট দল যে সমস্ত “অসাধারণ” রেকর্ড করেছ, তা একবার দেখে নেওয়া যাক……
১) ৩৬ বছর পরে ভারত একটা টেস্ট ম্যাচ নিউজিল্যান্ডের কাছে দেশের মাটিতে হেরেছে।
২) প্রথম বারের জন্য ভারতে এসে নিউজিল্যান্ড ৩-০ তে হারিয়েসিরিজ জিতে নিয়ে গেছে।
৩) নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৬ রানে বেঙ্গালুরুতে ভারতীয় দলের সব ব্যাটসম্যানরা আউট হয়ে, দেশের মাটিতে টেস্টে সর্ব নিন্ম রান করার “সৌজন্য” দেখিয়েছে।
৪) ১০বছর পরে ভারত পর পর দুটো সিরিজ হেরেছে।
৫) ইংল্যান্ডের লিডসে ভারত এক অনন্য রেকর্ডের অধিকারী হয়েছে। তা হল সেই টেস্ট ম্যাচে একটি ম্যাচে ৫টা সেঞ্চুরি করার পরও ভারতকে টেস্ট ম্যাচটা হারতে হয়েছে।
৬) ১৫ বছর পরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে হারতে হয়েছে।
৭) ২৫ বছর পরে দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতের মাঠ থেকে একটা সিরিজ জিতে নিয়ে গিয়েছে।
৮) আসামের বারসাপারা স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ৪০৮ রানে হারটা ছিল ভারতের সবচেয়ে বেশী রানে হার।
আরও সব “অসাধারণ” রেকর্ড করে ভারতীয় ক্রিকেট দল একটা কোচের “অসাধারণ কাজ” নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটীয় চিন্তায় যে এই মুহূর্তে অনেক পার্থক্য সেটা চোখে অঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই দক্ষিণ আফ্রিকা দল। ব্যাটিং বোলিং আর ফিল্ডিং সব জায়গাতেই ভারতকে পরাজিত দল বলেই মনে হয়েছে। মনে রাখতে হবে এনগিধি, রাবাদার মত খেলোয়াড়কে বাইরে রেখেও তাঁরা সিরিজ জিতল, দুটো টেস্ট ম্যাচের উপর সম্পূর্ণ দখল রেখে। এমনকি ভারতীয়রা যে স্পিনটা ভালই খেলে এটা যে একটা মিথ আবার প্রমাণ করল তাঁরা। দুটো টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিনাররা ২৫টা উইকেট নিয়ে প্রমাণ করল অন্তত এই ভারতীয় দলের স্পিনারদের সঙ্গে খেলবার ব্যাপারে অনেক কিছু এখনও শেখার আছে। দল থেকে সরে যেতে হয়েছে বিরাট কহলি, রোহিত শর্মা আর অনিল কুম্বলের মত খেলোয়াড়দের, কিন্তু যারা এসেছে দলে তাদের নিয়ে উঠছে নান প্রশ্ন। কোচ তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, তা তো জানাই ছিল। দেশের মাটিতে সব দলই তাদের মত করে পিচ বানায় ও জেতে। গৌতম গম্ভীর আসার পর দেখা গেছে ভারতের বানানো পিচেই ভারত হারে। অস্ট্রেলিয়ার কথা না হয় বাদই দিলাম, সেখানে গিয়ে ভারত খুবই কম জিতেছে। কিন্তু ইংল্যান্ডের মাঠেও ভারত প্রমাণ করেছে লড়াই করলেও, তাঁরা সিরিজ জেতার মত অবস্থায় ছিল না। আর গম্ভীর জমানায় যেভাবে ভারতীয় নিজেদের আত্মসমর্পণ করল তা ভারতীয় ক্রিকেটে এই শতাব্দীতে কমই দেখা গেছে। আসলে রাজনীতির আঙ্গুলি হেলনে ক্রিকেটের পদ পাওয়া যায়, কিন্তু সেই কাজকে সাফল্যে পরিনত করতে যোগ্যতা লাগে। এমনকি প্রশ্ন জাগে, আসামের বারসাপারা স্টেডিয়ামে কিভাবে এমন একটা দলের টেস্ট খেলা অনুষ্ঠিত করার অনুমতি পায় তাতেও কি একটা রাজনীতির গন্ধ থেকে যায় না ? এই ভারতীয় ক্রিকেটের লজ্জাজনক হারের পর কোচের কি হয় সেটা দেখার ইচ্ছা সব ক্রিকেটপ্রেমী মানুষেরই আছে। আর অন্যথায় ভারতীয় ক্রিকেট প্রেমীদের কিন্তু ২০২৭ সালের ডিসেম্বর অবধি হয়ত চোখের জলই ফেলতে হবে।
