অর্ণব দত্ত:
সারা দেশে ককরোচ জনতা পার্টি তুমুল আন্দোলনে সামিল নিট ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে। আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে বলে ঘোষণা করেছে সিজেপি। এই পরিস্থিতিতে সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত মনে করছেন, জেন জি প্রজন্মের মন-মানসিকতা বুঝতে হবে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সম্প্রতি এক্স হ্যান্ডেলে জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুক্তদের কঠোর সাজা দিতে এবার ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠন করা হবে।
জেন জি ভাগবত কিংবা মোদির কথায় কান দিতে নারাজ। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। দেশ স্বাধীনের পরে ৮০ বছর পেরোলেও দেখা যাচ্ছে, ভারতে বিচার বিভাগের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। এজন্যে এককভাবে কোনও রাজনৈতিক দলকে দোষারোপ করলে তা একচোখোমি হবে।
এনডিএ জমানায় ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ডাটা গ্রিডের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, সুপ্রিম কোর্টেই ঝুলে আছে ৯০ হাজারের চেয়ে বেশি মামলা। এবাদে হাইকোর্ট, নিম্ন আদালত-সহ অন্য আদালতগুলিতে নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় ৫ দশমিক ৬৪ কোটি মামলা। সারা দেশে হাইকোর্টগুলিতে ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা বর্তমানে ৬০ লক্ষ। নিম্ন আদালত এবং সাব-অর্ডিনেট কোর্টগুলিতে বছরের পর বছর নিষ্পত্তিহীন ৪ কোটিরও বেশি সংখ্যক মামলা। এই মামলাগুলির মধ্যে বহু মামলাই ১০ বছরের চেয়ে বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তিহীন।
ল কমিশন এই দুরবস্থা সম্পর্কে ১৯৮৭ সালে যে রিপোর্ট পেশ করেছে, অন্তত ৫০জন বিচারক ১০ লক্ষ বিচারপ্রার্থীর জন্যে নিয়োগ করা হলে পরিস্থিতি অনেকটা সামাল দেওয়া যেত।
এরপর একের পর এক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্ত ল কমিশনের সুপারিশ গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে মান্যতা পায়নি কেন, এই প্রশ্নও স্বাভাবিক। “ম্যান পাওয়ার প্ল্যানিং জুডিশিয়ারি” শীর্ষক ওই রিপোর্ট আজও কার্যকরী হয়নি।
সূত্রের খবর, বর্তমানে ভারতের আদালতগুলিতে যত সংখ্যক বিচারক থাকা উচিত, তার ৫০ ভাগও পূরণ করা হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, এক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলি যেন যথাযথ ব্যবস্থা নেয়। বর্তমানে সারা দেশে বিচারকের সংখ্যা ২১ হাজার। যা হওয়া উচিত ছিল ৫০ হাজার।
বিচার বিভাগের বর্তমান করুণ অবস্থার কথা রাজ্যসভায় লিখিতভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন কেন্দ্রীয় আইন প্রতিমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল। তিনি অবশ্য জানিয়েছেন, দেশের আদালতগুলিতে ৫ দশমিক ১৯ কোটি মামলা জমে। কবে এই মামলাগুলির নিষ্পত্তি হবে, তা এখনও বিশ বাঁও জলেই।
সূত্র্রের খবর, বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে মোট বিচারপতির সংখ্যা ৩৪জন। ২৮ নম্বর বিধি অনুসারে, সুপ্রিম কোর্টে বিচারপ্রার্থী উভয়পক্ষের আইনজীবীদের শুনানির জন্যে বরাদ্দ সময় ৩০ মিনিট। অন্যদিকে, হাইকোর্টগুলিতে শুনানির জন্যে বরাদ্দ সময় দুই থেকে সর্বাধিক ১৫ মিনিট।
বিভিন্ন সমীক্ষা এবং কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রক সূত্র্রের খবর অনুসারে, জেলা আদালতগুলির অবস্থা সবচেয়ে করুণ|। না আছে কাজ চালানোর মতো পরিকাঠামো, এমনকি আইনজীবীদেরও বসার ব্যবস্থাও নেই। জেলা আদালতগুলিতে বিচারপ্রার্থীদের ভিড় মাছের বাজারের মতো। বিচারপ্রার্থী দরিদ্র মানুষজনকেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বসার ব্যবস্থা না থাকায়। এবাদে হাতেগোনা নিম্ন আদালতে কম্পিউটার আছে। কিংবা ডিজিটালাইজড পরিকাঠামো আছে। ফলে মামলার রেকর্ড ধরে রাখতে এখনও মান্ধাতার আমলের পদ্ধতিই ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০২৬-২০২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে আইন মন্ত্রকের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে ৪ হাজার ৫০৯ কোটির চেয়ে সামান্য কিছু বেশি টাকা। মোট কেন্দ্রীয় বাজেট বরাদ্দের নিরিখে এটা নামমাত্র। শূন্য দশমিক শূন্য আট শতাংশ।
বাংলায় বিগত ১৫ বছরের তৃণমূল জমানাতেও রাজ্য বাজেটে বিচার বিভাগের জন্যে বরাদ্দ নামমাত্রই ছিল। ২০২৫-২০২৬ সালে তৃণমূল সরকার রাজ্য বাজেটের মোট বরাদ্দের শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ বরাদ্দ করেছে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ মোটে ১ হাজার ৬৭৭ কোটির চেয়ে সামান্য বেশি।।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পরিচালিত বাংলা এখন ডবল ইঞ্জিনের সরকার। ফলে দেথার এও দেখার, রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি শক্তিশালী করতে রাজ্য সরকার এবার কী কী পদক্ষেপ নেবে।