নয়ন বিশ্বাস রকি, আওয়ামী লীগের সাবেক ছাত্র নেতা, বাংলাদেশ
বাংলাদেশে জুলাই ২০২৪ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক পালাবদলের পর দলের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল বলে মনে করে আওয়ামী লীগ। এই দাবি জানিয়ে দলের তরফে আইসিসি-র প্রসিকিউটরের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক ‘আর্টিক্যাল ১৫ যোগাযোগ’ দাখিল করা হয়েছে। লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের স্টিভেন পাউলস কেসি গত বৃহস্পতিবার এই যোগাযোগ দাখিল করেন। এতে প্রসিকিউটরের কাছে বাংলাদেশে সংঘটিত অপরাধের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ
দাখিলকৃত অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার সাবেক সরকারের সঙ্গে যুক্ত আওয়ামী লীগ কর্মকর্তা ও কর্মীদের টার্গেট করে যে ব্যাপক প্রতিশোধমূলক সহিংসতা চালানো হয়েছে, তা খুন, কারাবন্দীকরণ এবং নিপীড়নসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য। ওই যোগাযোগে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে বাংলাদেশে এই গুরুতর অপরাধগুলো দেশে কোনো বাস্তবসম্মত তদন্ত বা বিচার হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলস্বরূপ, অপরাধীরা দায় থেকে সহজে মুক্তি পাচ্ছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০১০ সালের ২৩ মার্চ আইসিসি-এর রোম স্ট্যাটিউট অনুসমর্থন করে এবং এর ফলে ১ জুন ২০১০ তারিখে এই বিধি বাংলাদেশে কার্যকর হয়।
সহিংসতার ভয়াবহ বিবরণ
আর্টিক্যাল ১৫ যোগাযোগে সহিংসতা ও নির্যাতনের বেশ কিছু মারাত্মক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে:
ব্যাপক হত্যাকাণ্ড
অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই ২০২৪ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০০ আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মী নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই হিংস্র জনতার হাতে মারধর এবং গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে সাক্ষী ও ভিডিও প্রমাণ সরবরাহ করা হয়েছে।
ব্যাপক কারাবন্দীকরণ
যোগাযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত বা সংশ্লিষ্ট বলে মনে করা ব্যক্তিরা ভিত্তিহীন অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং জামিন বা অভিযোগ ছাড়াই কারারুদ্ধ রয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিবিদ, বিচারক, আইনজীবী, সাংবাদিক, এমনকি অভিনেতা ও গায়কেরাও।
হেফাজতে মৃত্যু
অভিযোগ করা হয়েছে, জুলাই ২০২৪-এর পর আওয়ামী লীগের ৪৫ জন নেতা-কর্মীর হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ‘হার্ট অ্যাটাক’-এ মৃত্যুর খবর দেওয়া হলেও তাদের দেহে “নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন” পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ এবং রাষ্ট্রীয় অভিযান
যোগাযোগে আরও বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন কর্তৃক ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে একটি যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল “আওয়ামী ফ্যাসিবাদ” দমন করা। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর এই যৌথ উদ্যোগে মাত্র ১২ দিনের মধ্যে ১৮,০০০ লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা যায়।
দায়মুক্তি আদেশ নিয়ে উদ্বেগ
যোগাযোগটি বাংলাদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষত, অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন কর্তৃক ১৪ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে জারি করা একটি ‘দায়মুক্তি আদেশ’ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ওই আদেশের মাধ্যমে ১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২০২৪-এর মধ্যে সংঘটিত কাজের জন্য “এই উত্থানে সমস্ত প্রচেষ্টা করা ছাত্র ও নাগরিকদের” বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা হয়রানি না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আইসিসি-তে দাখিলকৃত যোগাযোগে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, এই ধরনের একতরফা দায়মুক্তি প্রদান কেবল বিচারহীনতা তৈরি করে না, বরং এসব হামলায় অভিযুক্ত অপরাধীদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন সমর্থনের ইঙ্গিতও দেয়।
ন্যায়বিচারের স্বার্থে আইসিসি তদন্তের দাবি
যোগাযোগটি স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নির্যাতনের প্রতিকারে দেশীয়ভাবে কোনো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এই অবস্থায়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সর্বোত্তম সুযোগ হলো আইসিসি প্রসিকিউটরের দ্বারা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করা।
স্টিভেন পাউলস কেসি দাখিলকৃত যোগাযোগে মন্তব্য করেন, “রাজনৈতিক পালাবদলের পরিস্থিতিতে প্রতিশোধমূলক অপরাধ একটি তীব্র সমসাময়িক উদ্বেগের বিষয়। এই অপরাধগুলো সুস্পষ্টভাবে আইসিসি-এর এখতিয়ারভুক্ত এবং এর দমন ন্যায়বিচারের স্বার্থে অপরিহার্য।
